নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করতে হবে
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনে নিখোঁজ শিশুদের কতজন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে, বর্তমানে তাদের কী অবস্থা ইত্যাদি তথ্য উল্লেখ না থাকায় শিশু নিখোঁজের প্রকৃত চিত্র পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন সাংবাদিকদের জানান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে জনমনে বিভ্রান্তি নিরসনে স্থানীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। যাচাইয়ে দেখা গেছে, জানুয়ারি থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ৪৭৪টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, এখনো উদ্ধার হয়নি ৬৮ জন। তিনি জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার জিডি হয়েছিল। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা ফিরে এসেছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ জন, যা মোট নিখোঁজ শিশুর ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। এর মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৯৭০ জন। নিখোঁজ শিশুদের প্রায় ৮৭ শতাংশ উদ্ধার হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে ঘুরতে গিয়ে পথ ভুলে, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারায় কিংবা একা বাসায় ফেরার সময় অন্যত্র চলে গিয়ে নিখোঁজ হয়। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে অভিমান, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জার ভয়ে পালিয়ে থাকার কারণ পাওয়া গেছে। এছাড়া স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাক্সক্ষা, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা আদায়ের চেষ্টা, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে। রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে বসবাসকারি এসব মানুষের কাছে যেন রাষ্ট্র থেকেও নেই। রাষ্ট্র কি এবং তাদের মৌলিক অধিকার কি, তা তারা জানে না। তাদের জানানোর তেমন কোনো উদ্যোগও নেই। জনগণের এই উল্লেখযোগ্য অংশ চিরকাল অবহেলিতই থেকে যাচ্ছে। সমাজেও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে। তাদের জীবনমান বলে কিছু নেই। অথচ তাদের খোঁজ নেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র পরিচালকদের। তারা কীভাবে আছে, কোথায় যাচ্ছে, কি করছে, এসব খবর রাষ্ট্র ছাড়া কে নেবে? যে কারণেই হোক, বস্তি বা পথশিশু-কিশোর হারিয়ে যাওয়া বা নিখোঁজ হওয়া সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য স্বস্তির বিষয় নয়। এর নেতিবাচক প্রভাব আমাদের মূলধারার সমাজেও পড়ে। রাষ্ট্রের ব্যর্থতাও নির্দেশ করে। অথচ অবহেলিত, অচিহ্নিত ও ঠিকানাবিহীন অবস্থায় থাকা এসব মানুষের পুনর্বাসন ও সুন্দর জীবনযাপনের ব্যবস্থা করে দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সমাজেরও দায়িত্ব এদের দিকে খেয়াল রাখা। এসব মানুষ যে আমাদের মতোই সৃষ্টির সেরা, এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে। তাদের খারাপ অবস্থায় রেখে বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে, সভ্য সমাজ ভালো থাকতে পারে না। পুলিশকে ধন্যবাদ দিতে হয় এ কারণে যে, নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মানুষদের দ্রুত খুঁজে বের করছে। তবে যারা এখনো নিখোঁজ, তাদের হদিসও পুলিশকে দিতে হবে। পুলিশ সক্রিয় হলে যে কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায়, তার অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। সর্বোপরি সরকারকে বস্তিসহ অবহেলিত জনগোষ্ঠীর দিকে তাকাতে হবে। বস্তি কিংবা পথশিশুদের জন্মসনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়াসহ তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হবে। তারা হারিয়ে গেলেও যাতে সহজে খুঁজে পাওয়া যায়, এ ব্যবস্থা করতে হবে।
