হাম ও ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণহীন
বছরের শুরুতে প্রকট আকার ধারণ করে হাম-রুবেলার সংক্রমণ। হামে বিশেষত শিশু মৃত্যুর হার হঠাৎ করেই উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের আলোচনায় হামের টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শৈথিল্যের অভিযোগ উঠে আসে। তবে অতীত নিয়ে বা অতীতের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে বসে থেকে ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব নয়। দেশে হামের প্রকোপ বৃদ্ধির জন্য বিগত সরকারকে দায়ী করা হলেও পরিস্থিতি মোকাবেলা ও উত্তরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারের সংশ্লিষ্টরা ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও হাম-রুবেলা ভাইরাসজনিত মৃত্যুর মিছিল থামছে না। গত বুধবার প্রকাশিত রিপোর্টে দেশে হামে মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানা যায়। এসব মৃত্যুর বেশিরভাগই শিশু। পৃথিবীর আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠার আগেই অদৃশ্য ভাইরাসজনিত রোগে ঝরে পড়ছে শিশুদের জীবন। এটি পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের বিষয়। অন্যদিকে দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণে মৃত্যুর হার কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণে ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের এবং গতবছর মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের। চলতি বছর আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু সংক্রমণের হার আগের কয়েক বছরের তুলনায় কিছুটা কমলেও সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে তা আবারো উদ্বেগজনক হারে বাড়তে শুরু করেছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর একদিনে দেড়হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি এবং ৯ জনের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। চলতি বছর হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার অতিক্রম করার ঘটনাকে হামের মহামারি হিসেবে অভিহিত করা যায়। হাসপাতালে শিশুদের মৃত্যুর এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়া যায় না। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে। অতীতে আর কখনো বাংলাদেশে হামে এমন মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। বিগত সরকারের উপর দোষ চাপিয়ে সংশ্লিষ্টরা দায় এড়াতে পারেন না। হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় উপযুক্ত পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণের বদলে অপরিকল্পিত উদ্যোগের উপর জোর দিয়ে হামের সংক্রমণ কমিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। যদিও সরকারের ৬ মাস সময় এ ধরনের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট নয়। তবে গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে আসার পেছনে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের তিনমাসের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান, এডিস মশার বিস্তার রোধ ও জনসচেতনার সুফল পাওয়া গেলেও এ সপ্তাহে ডেঙ্গুতে একদিনে ৯ জনের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য অশনিসংকেত। গত এপ্রিলে শুরু হওয়া ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়েসী শিশুদের জন্য হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে ভুল পরিসংখ্যানের খেসারত দিচ্ছে শিশুরা। ধারণা করা হচ্ছে, এ কর্মসূচিতে অন্তত ৪৬ লাখ শিশু টিকাদানের তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে। উপাত্ত হিসেবে বলা যায়, গত জুনে একই বয়েসী ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও হামের টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশু। ভুল পরিসংখ্যানের কারণে যদি লাখ লাখ শিশু সরকারি টিকাদান কর্মসূচির বাইরে রয়ে যায় এবং হামে আক্রান্ত হয়ে শত শত শিশু মৃত্যু বরণ করে, তার দায় সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নিতে হবে। একদিকে টিকাদান কর্মসূচিতে ভুল হিসাবের দায়, অন্যদিকে ঢাকাসহ সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে হাম ও ডেঙ্গুর চিকিৎসায় পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার অভাব প্রকটভাবে ধরা পড়ছে। সামগ্রিক বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ পর্যালোচনার মাধ্যমে জরুরি বা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
