বেকারত্ব দূর করার পদক্ষেপ নিতে হবে
দেশে বেকারত্ব ক্রমবর্ধমান। প্রতিবছর যত কর্মপ্রত্যাশী মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, কর্মসুযোগ তার তুলনায় অনেক কম। ফলে বেকারের মিছিল প্রতিবছর দীর্ঘ হচ্ছে। বেকারদের মধ্যে অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত বেকার যেমন আছে, তেমনি আছে শিক্ষিত বেকার। অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত বেকাররা দেশে বা বিদেশে যে কোনো কর্ম করে তাদের বেকারত্ব ঘুচাতে পারে। কিন্তু শিক্ষিত বেকাররা সেটা পারে না। তাদের তথাকথিত ‘আত্মসম্মানবোধ’ সেখানে বাধা সৃষ্টি করে। বলা আবশ্যক, প্রতিবছর বিদেশে গড়ে ৮-১০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়। তার মধ্যে শিক্ষিতের সংখ্যা খুবই কম। দেশে সরকারি- বেসরকারি কর্মসংস্থান সেভাবে বাড়ছে না। বিনিয়োগ নেই। শিল্প কারখানা বাড়ছে না। বরঞ্চ অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে বেকারের সারিতে আরো বেকার যুক্ত হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি চাকরির অনেক পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে। সেখানে নিয়োগ হলেও অন্তত কিছু সংখ্যক বেকারের চাকরি হতে পারতো। সেটাও হচ্ছে না। মোটকথা: দেশের বেকারদের জন্য বিশেষ কোনো সুখবর নেই। পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করেন, অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত বেকারের চেয়ে এখন শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেশি বা বেশি হওয়ার পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। প্রতিবছর দেশের সরকারি-বেসরকারি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা বেরিয়ে আসছে, তাদের অতি নগণ্য সংখ্যকের সরকারি- বেসরকারি পর্যায়ে চাকরি-বাকরি হচ্ছে। অধিকাংশেরই বেকার থাকতে হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রকৃতপক্ষে বেকার তৈরির কারখানা হিসেবে ভূমিকা রাখছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। শিক্ষিত বেকারের প্রকৃত সংখ্যা প্রতিবছরই বাড়ছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে সুনির্দিষ্ট করে না বলে জানিয়েছেন, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় চার কোটি। তিনি ওই অনুষ্ঠানে আরো বলেছেন, একটি চাকরির পদের জন্য পাঁচ থেকে ছয় লাখ পর্যন্ত আবেদন জমা পড়ছে। তার এই বক্তব্যের মধ্যে বেকারত্বের একটা ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। এটা নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটা বড় সমস্যা। বিদেশে কর্মসংস্থানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়া সুবিবেচনার কাজ হবে না বা হতে পারে না। অর্থনৈতিক মন্দা, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ইত্যাদি কারণে বিদেশে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে। প্রবাসী কর্মীরা দেশে ফিরে আসতে পারে। সেমত আশংকায় দেশের অর্থনীতি সুগঠিত ও সুশৃংখল করার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের একটা শক্ত ভিত নির্মাণ করার বিকল্প নেই। অর্থনীতি চাঙ্গা করার প্রধান উপায় বিনিয়োগ। বিনিয়োগ হলে উৎপাদন ও রফতানি বাড়বে। বাড়বে কর্মসংস্থানও। বেকারত্ব নিরসন এ মুহূর্তে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। সেজন্য বিনিয়োগ-শিল্পায়নের অপরিহার্যতা প্রশ্নাতীত। সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশি বিনিয়োগকারীদের যেমন বিভিন্ন আশ্বাস দিয়ে বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে, তেমনি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদাত্ত আহবান করা হচ্ছে বিনিয়োগের জন্য। প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক চীন সফরের সময় চীন বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, প্রযুক্তি সহযোগিতা ইত্যাদির যে আশ্বাস দিয়েছে তা অভূতপূর্ব। বাংলাদেশের উন্নয়ন-সমৃদ্ধির স্বর্ণদুয়ার খুলে দিয়েছে চীন। আমরা যদি চীনা সহযোগিতার এই সুযোগ নিতে পারি, তাহলে আমাদের আর পেছনে তাকাতে হবে না। চীনের তরফে যেসব আশ্বাস ও প্রস্তাব পাওয়া গেছেÑ যেমন, ত্রিদেশীয় করিডোর, তিস্তা মহাপ্রকল্প, পদ্মা ব্যারাজ ইত্যাদির ব্যাপারে বাংলাদেশকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সুযোগ সবসময় আসে না। এলে তা দ্রুত কাজে লাগাতে হয়। মনে রাখতে হবে, চীনের বিনিয়োগের স্থানের অভাব নেই। বিনিয়োগ অনেক দিন এখানে বসে থাকবে না। চীনসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বেকারত্ব দূর করতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানে কোটাবিরোধী আন্দোলনে সূচিত হলেও এর মর্মমূলে ছিল বৈষম্য, বঞ্চনা, বেকারত্ব, অত্যাচার-নির্যাতন ও জুলুমের প্রতিক্রিয়া। ভারতে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের অভিমুখে ছিল প্রশ্নপত্র ফাঁস, পেছনে ছিল বৈষম্য, বঞ্চনা, বেকারত্বের যন্ত্রণা। এসব দিক খেয়াল রেখে সরকারকে সমতা, ন্যায্যতা, ন্যায়বিচার ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার ওপর যথোচিত গুরুত্ব দিতে হবে।
