সম্পাদকীয়

চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে

দেশের প্রায় সব জেলায় চাঁদাবাজি ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে। বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী থেকে শুরু করে ফুটপাতের দোকানদাররাও চাঁদাবাজি থেকে রেহাই পাচ্ছে না। যতই দিন যাচ্ছে, চাঁদাবাজি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে। গত সপ্তাহে চট্টগ্রামে একটি বড় প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সন্ত্রাসীরা এর মালিকপক্ষকে দুই কোটি টাকা চাঁদা এবং মাসে দশ লাখ টাকা দেয়ার জন্য হুমকি দিয়ে এসেছে। তা নাহলে, প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের এ ধরনের দৌরাত্ম্য কমবেশি সারাদেশেই চলছে। গতকাল ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনে রাজধানীর চাঁদাবাজির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, রাজধানীর ৪৫টি থানা এলাকায় প্রায় ১২০০ চাঁদাবাজ সক্রিয় রয়েছে। ক্ষিলখেত, কলাবাগান, মোহাম্মদপুর, হাতিরঝিল, বাড্ডা, উত্তরা, ভাটারা, খিলগাঁও, পল্লবী, আদাবর এলকায় চাঁদাবাজরা সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। অন্যান্য এলাকায়ও কমবেশি চাঁদাবাজি চলছে। চাঁদাবাজির এ চিত্র শুধু রাজধানীতেই নয়, দেশের সর্বত্রই বিরাজমান। দেশে চাঁদাবাজি, দখলবাজি নতুন কিছু নয়। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে। যথাযথ পদক্ষেপ না থাকায় তা দমন করা যাচ্ছে না। এ নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। তাতে কাজ হয়নি। চাঁদাবাজদের সাথে রাজনৈতিক দলের একশ্রেণীর প্রভাবশালী নেতা ও আইনশৃৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যর সংশ্রব ও প্রশ্রয় থাকার কারণে চাঁদাবাজি নির্মূল করা যাচ্ছে না। ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিগত দেড় দশকের শাসনামলে চাঁদাবাজি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। প্রকাশ্যেই তা চলেছে। ফুটপাতের দোকান, মার্কেট, বাসস্ট্যান্ড, ট্রেন স্টেশন, আবাসনখাতসহ বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজির ঘটনা নিয়মিত ছিল। এর সাথে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ সরাসরি জড়িত ছিল। তাদের চাঁদাবাজির কারণে ব্যবসায়ীদের নাভিশ্বাস উঠেছিল। মানুষের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার পতনের অন্যতম কারণ ছিল, চাঁদাবাজি, দখলবাজিতে অতীষ্ঠ মানুষের ক্ষোভ। হাসিনার পতনের পর আশা করা হয়েছিল, চাঁদাবাজি, দখলবাজির অবসান ঘটবে। দেখা যাচ্ছে, তা ঘটেনি। আগের চাঁদাবাজদের জায়গায় নতুন চাঁদাবাজরা স্থলাভিষিক্ত হয়েছে, কিংবা পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে চাঁদাবাজি বহাল রেখেছে। দেশে যে কথাটি বহুল প্রচলিত তা হচ্ছে, একদল ক্ষমতা থেকে গেলে, আরেকদল ক্ষমতায় এলে শুধু চাঁদাবাজদের পরিবর্তন ঘটে। চাঁদাবাজি বন্ধ হয় না। এটা পালাবদলের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে এখন ক্ষমতায়। দেখা যাচ্ছে, চাঁদাবাজির অপসংস্কৃতির পরিবর্তন হয়নি। আগের মতোই চাঁদাবাজরা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, হাসিনার শাসনামলে বিএনপির লাখ লাখ নেতাকর্মী সীমাহীন নিপীড়ন-নির্যাতন, খুন-গুম, হামলা-মামলা, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছে। অনেকের বাড়িঘর, ব্যবসা-বাণিজ্য আওয়ামী পান্ডারা দখল করে নিয়েছিল। তারা যে কিছু করে জীবনযাপন করবে, এ সুযোগও ছিল না। হাসিনার পতনের পর তাদের কেউ কেউ চাঁদাবাজি-দখলবাজির মতো অপকর্মে জড়িয়েছে। নির্বাচনের আগে চাঁদাবাজির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিএনপি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিল। চাঁদাবাজির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রায় ছয়-সাত হাজার নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কারসহ অনেকের বিরুদ্ধে দল থেকে মামলা করা হয়। তাতে চাঁদাবাজি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দল ক্ষমতায় আসার পর তা আবার বেড়ে গেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, চাঁদাবাজি, দখলবাজি বন্ধ করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সিদ্ধান্ত থাকা অপরিহার্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও কঠোর অবস্থান থাকা দরকার। চাঁদাবাজদের কোনো দল নেই, তারা শুধুই চাঁদাবাজÑএ মনোভাব থাকা জরুরি। চাঁদাবাজির সাথে যেই জড়িত থাকুক, যতই প্রভাবশালী হোক, তার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি বিএনপিকে এ কথাও মাথায় রাখতে হবে, যেসব নেতাকর্মী বিগত দেড়যুগ ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে অবর্ণনীয় নিপীড়ন-নির্যাতন ও জেল-জুলুমের শিকার হয়েছে, সর্বস্ব হারিয়েছে, তাদের কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনে দলকে কিছু করতে হবে। দল কি তা করেছে? সহজ পথ হিসাবে, দলীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি এবং দখলবাজির সুযোগ দেয়া দলের পক্ষে মোটেই সমীচীন হতে পারে না।

চাঁদাবাজ-দখলবাজকে অপরাধী হিসেবে দেখতে হবে। ক্ষমতাসীন দলের কেউ জড়িত থাকলে পার পেয়ে যাবে, এই অপসংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বলা বাহুল্য, ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতাকর্মীর অপরাধ মানুষের কাছে অনেক বড় হয়ে দেখা দেয়। এর দায় ক্ষমতাসীন দলের উপরই বর্তায়। বর্তমানে যেভাবে চাঁদাবাজি চলছে, তার দায়ও ক্ষমতাসীন বিএনপির উপর বর্তাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ জমা হচ্ছে। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, চাঁদাবাজরা তাকে ক্ষমতায় আনেনি, এনেছে সাধারণ মানুষ। এখন তারাই যদি চাঁদাবাজদের জুলুমের শিকার হয়, তাহলে তারা কোথায় যাবে? এমনিতেই দেশের অর্থনীতি নাজুক, ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম মন্দাবস্থার মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে যদি চাঁদাবাজি চলতে থাকে, তাহলে মানুষের ক্ষোভ ক্ষমতাসীন বিএনপির উপরই পড়বে। চাঁদাবাজির কারণে বিএনপির যে বদনাম হচ্ছে, তার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে যে পড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। এসব নির্বাচন নির্দলীয় হলেও বিএনপির সমর্থিত প্রার্থী থাকবে। ভোটাররা তখন চাঁদাবাজির কারণে বিএনপির প্রার্থীর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। অন্যদিকে, বিরোধীদলগুলো এই চাঁদাবাজিকে ভোটারদের সামনে তুলে ধরবে। এতে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। হাসিনার পতনের পর মানুষ যে পরিবর্তন আশা করেছিল, তা যদি ক্ষমতাসীন দলের সংশ্রবে বা প্রশ্রয়ে মুখথুবড়ে পড়ে, সেই পুরনো অপসংস্কৃতি বহাল থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের হতাশ ও ক্ষুব্ধ হওয়া স্বাভাবিক। ক্ষমতাসীন বিএনপিকে এ বিষয়টি সিরিয়াসলি বিবেচনায় নিতে হবে। চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট