শাপলা চত্বর গণহত্যার বিচার নিয়ে এইচআরডাব্লিউ’র অনাকাঙ্খিত প্রতিক্রিয়া
ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুম-খুনের অসংখ্য ঘটনার পাশাপাশি বেশকিছু মাস কিলিংয়ের ঘটনাও সংঘটিত হয়েছে। পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের নামে সেনা অফিসারদের হত্যার ঘটনা নিছক বিদ্রোহের ঘটনা ছিল না। এটি ছিল একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। একইভাবে ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে দেশের ধর্মপ্রাণ তৌহিদি জনতার কণ্ঠকে অস্ত্রের ভাষায় রুদ্ধ ও স্তব্ধ করে দেয়ার একটি পরিকল্পিত নীল নকশার অংশ। হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনের বেশিরভাগই তৎকালীন সরকার মেনে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। শাপলা চত্বরের সমাবেশে হেফাজতে ইসলাম সরকারের পতন বা কোনো শক্ত আল্টিমেটামও দেয়নি। তারা শুধু তাদের আমিরের মঞ্চে আগমনের অপেক্ষায় রাতে শাপলা চত্বরে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। গণআন্দোলন দিনের পর দিন হতে পারে। বিশ্বের সব দেশেই তা হয়ে থাকে। একই সময়ে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ, আমেরিকায় ওয়ালস্ট্রিট অক্যুপাই আন্দোলন, কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন কয়েক সপ্তাহ ধরে চলেছে। কিন্তু এভাবে রাতে রাস্তার বাতি নিভিয়ে নিরস্ত্র নিরীহ হাজার হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর যৌথ বাহিনীর ভয়ঙ্কর গণহত্যার ঘটনার নজির সাম্প্রতিক বিশ্বের ইতিহাসে আর একটিও নেই। শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের উপযুক্ত তদন্ত, বিচার কিংবা রাজনৈতিক প্রতিবাদ-প্রতিক্রিয়া হলে চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষকে এভাবে হত্যা করে ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার সাহস পেত না। দেশ থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা লুট ও পাচার করে বিদেশে পালিয়ে থাকা ফ্যাসিস্টের দোসর ও অলিগার্কদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এইচআরডাব্লিউ শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে অহেতুক প্রশ্ন তোলা নিয়ে নানা জল্পনার ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের চিফ প্রসিকিউটার মো. আমিনুল ইসলাম এইচআরডাব্লিউর অভিযোগকে আসামী পক্ষ বা কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের দ্বারা পক্ষপাতদুষ্ট ও একপেশে হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। গত বুধবার নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল দেশীয় আইনে পরিচালিত একটি বিশেষ আদালত, বিদেশি বিচারক ও আইনজীবী এনে এখানে বিচার পরিচালনা করার কোনো প্রশ্নই আসে না। প্রসিকিউটার ও সংশ্লিষ্টদের মতামত, বিচার ও তদন্ত প্রক্রিয়ার কোনো বিষয় উল্লেখ না করেই একটি ভয়ানক গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার হীনচেষ্টার সাথে এইচআরডাব্লিউর মতো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার এমন একপেশে ভূমিকা খুবই দুঃখজনক। গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, ভারতের মতো দেশগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে অসংখ্য গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলেও এইচআরডাব্লিউ’র কোনো প্রতিক্রিয়া বা চোখে পড়ার মত কোনো প্রতিবেদন দেখা যায়নি। গাজা উপত্যকাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে সেখানে যে এথনিক ক্লিনজিং করা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধেও এইচআরডাব্লিউকে দায়সারা প্রতিক্রিয়ার বাইরে তেমন কোনো ভূমিকায় দেখা যায়নি। স্পষ্টতই তারা পশ্চিমাদের ইসলাম বিদ্বেষী এজেন্ডা বা ইসলামোফোবিক ন্যারেটিভের দ্বারা প্রভাবিত। শাপলাচত্বরে আলেম-ওলামা ও মাদরাসা শিক্ষার্থীদের সমাবেশে হামলা করতে যৌথ বাহিনীর ৫ হাজারের বেশি সদস্য যুদ্ধংদেহী সাজে মাঠে নেমেছিল, লক্ষাধিক বুলেট খরচ করার তথ্যও বেরিয়ে এসেছিল। তবে পুরো এলাকাকে অন্ধকার করে অত্যন্ত কঠোরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কারণে হতাহতের প্রকৃত চিত্র তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া না গেলেও অর্ধশতাধিক মানুষ নিহত হওয়ার চিত্র তখনই বেরিয়ে এসেছিল। হতাহতের প্রকৃত সংখ্যাসহ প্রকৃত ঘটনা উপযুক্ত তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বেরিয়ে আসতে পারে। এমন একটি ঘটনার বিচার ও হত্যাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা আইনের শাসন ও রাষ্টীয় অনুশাসনের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের ঘটনার বিচার না হলে ক্ষমতাসীনরা বার বার স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সাহস দেখাবে। তাই, এইচআরডাব্লিউর মতো মানবাধিকার সংস্থার কাছে হত্যাকারীদের পক্ষপাত ও মায়াকান্না কেউ দেখতে চায় না। তাদের কাছে মানুষ ন্যায়বিচারের প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করে। শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডসহ দেশে সংঘটিত সব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও সঠিক বিচার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
