বিদেশি বিনিয়োগের পরবর্তী গন্তব্য বাংলাদেশ, গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ছে, ফিরছে স্বস্তি প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরলেই ব্যাপক কর্মযজ্ঞ
দেশে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ। এরপরও দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে মানুষ। বৈশ্বিক সংকট ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিকতায় ফিরতে যাচ্ছে। গতকালও এক লাখ ৭৫ হাজার ঘনফুট ধারণক্ষমতার একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) জাহাজ ভিড়েছে মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনালে। ওই কার্গো থেকে মার্কিন কোম্পানির এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে এলএনজি সরবরাহ শুরু হয়েছে। এর ফলে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। এতে দেশে চলমান গ্যাস সংকট অনেকটা কেটে যাবে। এর আগে গত বুধবারও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি নিয়ে একটি জাহাজ কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভিড়ে। জাহাজ দুটির সরবরাহ ক্ষমতা ১০৫০ থেকে ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাসের অভাবে চট্টগ্রামের চারটিসহ দেশে বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। আর এ কারণে বিদ্যুৎ ঘাটতিও বেড়ে যাচ্ছিল। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এবং পাইপলাইনে থাকা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফিরলে এ সংকট কাটবে এমন প্রত্যাশা বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের। আর তাই নতুন দুটি জাহাজ আসায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পেট্রোবাংলার প্রতিবেদন অনুসারে, এখন দেশে গ্রিড-সংযুক্ত গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের দৈনিক চাহিদা আড়াই হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছুটা বেশি, যা চাহিদার ৩৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির একজন কর্মকর্তা জানান, দেশীয় সামিট পাওয়ারের টার্মিনাল থেকে ৫২০ মিলিয়ন এবং মার্কিন কোম্পানি পরিচালিত এক্সিলারেট টার্মিনাল থেকে পাওয়া যাচ্ছিল ১৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। গত দুই সপ্তাহ ধরে গ্যাস সরবরাহ ৭০০-৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে স্থির ছিল। গত প্রায় দেড় মাস ধরে এলএনজি সংকটের কারণে সরবরাহ কমে গিয়েছিল। তাই দুটি এলএনজিবাহী কার্গো আসায় পুরোদমে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এলএনজি এবং গ্যাস ক্ষেত্র থেকে পাওয়া গ্যাস মিলিয়ে দেশে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ২৩৩৪ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ পাওয়া যায় ২৬০০-২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এদিকে বিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের হিসাব বলছে, এখন দেশে গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে গড় চাহিদা ১৫ হাজার মেগাওয়াটের মতো। এখন গড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। এর প্রধান কারণ হচ্ছে জ্বালানির সংস্থান না থাকা। বিশেষ করে প্রধান জ্বালানি গ্যাসের তীব্র সংকট তৈরি হওয়া। প্রধানমন্ত্রীর তৎপরতায় দ্রুত গ্যাস সংকট দূর হলে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্রুত পদক্ষেপে দেশে লোডশেডিং কমানোর উদ্যোগ শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি করতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং শিল্পে চাহিদা মেটাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা) সূত্র জানিয়েছে, দেশে বেসরকারি খাতে ৫৩টি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। এ কেন্দ্র থেকে দৈনিক পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরলে জাতীয় গ্রিডে চলতি মাসেই আরো প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হতে পারে। এতে আশা করা যায়, লোডশেডিং অনেকটা কমে আসবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে সাশ্রয় হওয়া গ্যাস শিল্পে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
এদিকে বিদ্যুৎ খাতে নতুন সুখবর চলতি মাসেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। মাসের পর মাস পিছিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের স্বপ্নের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আগামী নভেম্বর মাসে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে আসছে। দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্য দিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করবে দেশ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এলে দেশে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে দীর্ঘদিন থেকে বিপর্যস্ত অর্থনীতি। এর পরও দীর্ঘদিন পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ায় দেশে গণতান্ত্রিক ধারায় এবং রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। এ কারেণ ইতোমধ্যে প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি, রিজার্ভের শক্তিশালী অবস্থান, রফতানি আয়ে নতুন গতি, ডলারের সংকট কমে আসা এবং হুন্ডি-অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি আরোপে সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের আশা প্রকাশ করেছেন এবং বোয়িং ক্রয় নিয়ে আলোচনার কথা জানিয়েছেন। এই সফর বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পর অর্থনীতিতে ব্যাপক গতি আসবে। ইতোমধ্যে উন্নয়ন সহযোগী চীন, জাপান, কোরিয়া, সউদী আরব, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে উদগ্রীব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও বিনিয়োগের জন্য। এছাড়া চীনের অর্থনৈতিক করিডোরের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের পথে। প্রধানমন্ত্রী দেশের কৃষি ও প্রকৃতিকে রক্ষা করতে এবং নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিতে পদ্মা ও তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন, যা দেশের অর্থনীতির চিত্র পাল্টে দিবে। জিডিপির আকার রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। একই সঙ্গে মক্কা জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করবে এবং বিনিয়োগ বাড়বে। বর্তমান জনশক্তি রফতানি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়ে সেসব দেশে আরো ব্যাপক হারে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। রেমিট্যান্স প্রবাহ আরো বাড়বে। অন্যদিকে সরকার তার কূটনৈতিক দক্ষতা কাজে লাগাতে পারলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রফতানির পাশাপাশি পণ্য রফতানির সুযোগ বাড়বে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। আর তাই পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতি এবং অর্থনীতির যে গতিধারা তাতে বিদেশি বিনিয়োগের পরবর্তী গন্তব্য বাংলাদেশ।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট দূর করা সম্ভব হয় তাহলে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার তিনি যে স্বপ্ন দেখছেন, তা বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা প্রফেসর রাশেদ আল তিতুমীর বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে চলছেন। তার নির্দেশনায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করতে সরকার কাজ করছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে উৎপাদনমুখী শিল্পায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
দেশের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস পোশাক খাত। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকটের মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সংকটের সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। এর টেকসই সমাধান করা গেলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে। সূত্র: ইনকিলাব
