নাগরিক সেবাবঞ্চিত রাজশাহীর মিডল চরবাসী
স্টাফ রিপোর্টার:
পদ্মার বুকে ভেসে ওঠা প্রায় ১৫ মাইলের এক ছোট্ট ভূখণ্ড, নাম তার ‘মিডল চর’। দিগন্ত-বিস্তৃত নীল-সাদা আকাশ, চোখ ধাঁধানো সবুজের সমারোহ আর বাতাসের গর্জন মিলে চরটিকে দিয়েছে স্বর্গীয় সৌন্দর্য। প্রাকৃতিক এই রূপের কারণে অনেকেই একে ডাকেন ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে। তবে এই অপার সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক করুণ বাস্তবতা। খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসাসহ মৌলিক নাগরিক সেবাবঞ্চিত হয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন এখানকার প্রায় ৭ শতাধিক বাসিন্দা।
রাজশাহীর পবা উপজেলাধীন হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত এবং চরখিদিরপুর ও চরখানপুরের লাগোয়া এই চরটি প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৪ কিলোমিটার প্রশস্ত। এখানে রয়েছে ১৪০ থেকে ১৫০টি বসতি। চরের প্রধান অর্থনৈতিক সম্বল কৃষি ও পশুপালন। ধান, পাট, গম ও কালাই চাষের পাশাপাশি চরে প্রায় ৪ হাজার গরু, ৫ শতাধিক মহিষ এবং বহু ছাগল-ভেড়ার পদচারণা থাকলেও দীর্ঘদিনের নানামুখী সংকটে থমকে আছে চরবাসীর জীবন।
স্বাস্থ্যসেবা সংকট ও দাফন-কাফনের ট্র্যাজেডি: দুর্গম এই চরে কোনো হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ফার্মেসি তো দূরের কথা, প্রাথমিক চিকিৎসার ন্যূনতম ব্যবস্থাও নেই। নদী পার হয়ে শহরে নেওয়ার পথেই অনেক সময় আশঙ্কাজনক রোগী কিংবা সাপে কাটা মানুষ মারা যান। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে রাতে বা বৈরী আবহাওয়ায় যাতায়াতই মূল বাধা হয়ে দাঁড়ায়। চিকিৎসাসেবার এই করুণ চিত্র মৃত্যুর পরও পিছু ছাড়ে না। চরের নিচু পলিমাটিতে দাফনের সুব্যবস্থা না থাকায় লাশ নৌকায় করে নদীর ওপারে খোজাপুর বা দাসমারি কবরস্থানে নিয়ে যেতে হয়। নিজ ভূমিতে প্রিয়জনকে দাফন করতে না পারাকে চরবাসী তাদের জীবনের বড় এক ট্র্যাজেডি বলে মনে করেন।
যোগাযোগ, বাজার ও বিদ্যুতের ভোগান্তি: চরে কোনো কাঁচাবাজার বা মুদি দোকান না থাকায় দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে নদী পার হয়ে ‘সাহেব বাজার’ বা ‘কাটাখালি’ ছুটতে হয়। আবহাওয়া খারাপ থাকলে পারাপার বন্ধ হয়ে তৈরি হয় খাদ্য সংকট। অন্যদিকে চরে কোনো জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ নেই; একমাত্র ভরসা সোলার প্যানেল। তবে পর্যাপ্ত সোলার ও সচল ব্যাটারির অভাবে রাতের বেলা অধিকাংশ পরিবারকে অন্ধকারেই দিন কাটাতে হয়।
বন্যার তাণ্ডব ও সহায়-সম্বল হারানোর ভয়: প্রতি বছর ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে প্রায় দেড় থেকে দুই মাস চরে বন্যা স্থায়ী হয়। আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেলে বাসিন্দাদের উঁচু স্থানে বা মেইনল্যান্ডে আশ্রয় নিতে হয়। এ সময় সাপের উপদ্রব বাড়ে এবং বিপুল গবাদিপশু স্থানান্তরের সময় দুর্ঘটনায় মারা যায় বা পা ভেঙে পঙ্গু হয়। সেই সাথে একমাত্র মোংলা ফসল বন্যায় ভেসে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে পড়ে চরের অর্থনীতি। উপরন্তু, দীর্ঘ ৪০-৫০ বছর ধরে বাপ-দাদার আমলের জমির কোনো নামজারি বা সরকারি রেকর্ড না থাকায় স্থায়ী উচ্ছেদের আতঙ্কে দিন কাটে চরবাসীর।
শিক্ষা ব্যবস্থার দুরবস্থা: চরের শিক্ষা ব্যবস্থা একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওপর নির্ভরশীল। ২৪০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ৫ জন শিক্ষক থাকলেও যাতায়াত সমস্যার কারণে ওপার থেকে আসা শিক্ষকরা নিয়মিত বা পর্যাপ্ত সময় পাঠদান করতে পারেন না। প্রাথমিকে পড়া শেষ হলেও চরে কোনো হাই স্কুল বা মাদ্রাসা না থাকায় এবং শহরে পড়াশোনার খরচ চালাতে না পেরে অধিকাংশ শিশুর শিক্ষার ইতি ঘটে সেখানেই।
চরবাসী ও ভুক্তভোগীদের আকুতি: সীমা বেগম নামের এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অসুস্থ হলে যে টিকতে পারে সে হাসপাতালে পৌঁছায়, আর না পারলে মারা যায়। বন্যার সময় পরের বাড়িতে থাকতে হয়, দাফন বা বাজারের কোনো ব্যবস্থা নেই।” একই কথা জানান কৃষক আমিরুল ইসলাম ও স্থানীয় এক রাখাল; তাদের মতে যাতায়াত ও বাজারের অভাবে একটা সাধারণ কেনাকাটাতেই পুরো দিন নষ্ট হয়ে যায়। বন্যার ভয়াবহতা তুলে ধরে মো. শাহজাহান বলেন, গবাদিপশু ও মানুষের সুরক্ষায় একটি উঁচু আশ্রয়কেন্দ্র এখন সময়ের দাবি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজিদ সিদ্দিকী চরটি ঘুরে দেখে বলেন, “প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে জায়গাটি দারুণ হলেও নদীর ঝুঁকি ও নাগরিক সেবার অভাব চরবাসীকে জর্জরিত করে রেখেছে। সরকারের উচিত দ্রুত সহায়তার হাত বাড়ানো।”
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার শহিদুল ইসলাম জানান, প্রায় ৪০০ ভোটার ও ৭০০ জনসংখ্যার এই চরে ৪ হাজারের মতো গরু থাকলেও কোনো চিকিৎসা, বাজার বা দাফনের সুবিধা নেই। একটি হাসপাতাল, উচ্চ বিদ্যালয়, পর্যাপ্ত সোলার প্যানেল এবং বন্যার সময় মানুষ ও গবাদিপশুর আশ্রয়ের জন্য একটি উঁচু সাইক্লোন কেল্লা নির্মাণের দাবি জানিয়ে তিনি চরবাসীর জীবনমান উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
