সম্পাদকীয়

অ্যাপভিত্তিক ঋণে প্রতারণার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে

অত্যাধুনিক নানা প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে আমাদের চলাফেরা অনেক সহজ হয়েছে। অফিস-আদালতের কাজ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রতিটি কাজে লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। এতে সময় যেমন বেঁচেছে, কাজেও এসেছে গতি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন অ্যাপ এখন অনেকের দীর্ঘ সময়ের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রযুক্তিই এখন প্রতারকচক্রের কাছে মোক্ষম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। গত বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, মোবাইলে অ্যাপভিত্তিক ঋণ নিয়ে বহু মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। বেশ কিছু অ্যাপ পরিচালনার ক্ষেত্রে ধরাবাঁধা আইন মানছে না, এসবের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, অ্যাপগুলো সাধারণত অল্প সময়ের মধ্যে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দিয়ে থাকে। সাধারণ লোকজনও সহজে ঋণ পাওয়ার আশায় এসব অ্যাপের দ্বারস্থ হয়। ঋণ গ্রহণের অংশ হিসেবে নানা তথ্য যুক্ত করতে হয়। এর পরই অ্যাপ কর্তৃপক্ষ আর কথামতো আচরণ করে না। নানা অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা দাবি করে থাকে। আবার কেউ যদি সেই টাকা দিতে না চায়, তাহলে ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়াসহ নানাভাবে জিম্মি করা হয়। এমন এক ভুক্তভোগী রাজধানী মিরপুরের সাঈদ মিয়া। জরুরি প্রয়োজনে তিনি একটি অ্যাপ থেকে ২৪ হাজার টাকা ঋণ নেন। এক সপ্তাহ পরই অ্যাপে সুদসহ তাঁর বকেয়া দেখানো হয় ৮১ হাজার টাকা। এরপর তিনি ৫৪ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। বাকি অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভয়ভীতি দেখানো হয়। শুধু সাঈদ মিয়া নন, এমন প্রতারণার শিকার বহু মানুষ।

অ্যাপগুলো ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের প্রচার-প্রসার করে থাকে। আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন বানিয়ে মানুষের চোখের সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয়। আর্থিক অনটনে থাকা মানুষ এসব ফাঁদে পা দেয়। খবরে একটি অ্যাপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেটির পরিচালনাকারীদের নির্দিষ্ট কার্যালয় বা স্থায়ী ঠিকানা পর্যন্ত নেই। অথচ গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্লে স্টোরে আসা অ্যাপটি এখন পর্যন্ত পাঁচ লাখের বেশিবার ডাউনলোড করা হয়েছে। জানা গেছে, বাজারে অন্তত ৩০টি অ্যাপ রয়েছে, যারা ঋণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। অথচ অনুমোদন ছাড়া ঋণ বিতরণ এবং নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর্থিক সেবার প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করা আইনসিদ্ধ নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বৈধভাবে ঋণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অনুমোদিত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জুন মাসে ব্যাংক ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। আর মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) ২০২৪ সালের জুনের হিসাব অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণের স্থিতি ছিল দুই লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। তবে বৈধ ঋণসেবার বাইরে জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত ও সহজে ঋণ পাওয়ার যে চাহিদা রয়েছে, সেটিকেই কাজে লাগাচ্ছে অননুমোদিত অ্যাপগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান যথার্থই বলেছেন, ‘অ্যাপভিত্তিক ঋণ প্রতারণা ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা। এ ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচতে সবকিছুর আগে সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে।’ আমরা মনে করি, এই যুগে প্রযুক্তির ব্যবহার আরো নিরাপদ ও গ্রাহকবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যেসব অ্যাপের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে, অভিযোগগুলো অবশ্যই খতিয়ে দেখা দরকার, অপরাধ প্রমাণিত হলে সেগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করাই যুক্তিযুক্ত। একই সঙ্গে অননুমোদিত অ্যাপগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট