অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতার তদন্তে অগ্রগতি নেই বহাল তবিয়তে রাসিকের রাজস্ব কর্মকর্তা

স্টাফ রিপোর্টার

একের পর এক অভিযোগের পরও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ নুর-ই-সাইদ বহাল তবিয়তে রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হলেও কোনো অগ্রগতি নেই। এমন কি তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেইনি রাসিক কর্তৃপক্ষ। তার তদন্তের বিষয়টি নিয়ে খোদ রাসিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কর্মচারিরা আঙ্গুল তুলছে শুরু করেছে। আর কর্মচারিরা বলছেন, আদৌ সুষ্ঠু তদন্ত হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এছাড়া প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ নুর-ই-সাইদের বিষয়টিও রাসিক কর্তৃপক্ষের জোরালোভাবে দেখছে না এমন অভিযোগ রয়েছে।

রাসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ নুর-ই-সাইদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সাবেক পলাতক মেয়র লিটনের সাথে যোগসাজস করে ক্ষমতার দাপটে রাসিকের রাজস্ব বিভাগকে তিনি কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন। বর্তমানও তার নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে রাসিকের রাজস্ব বিভাগ। ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে ইতিমধ্যে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ নুর-ই-সাইদের মানববন্ধন ও রাসিকের প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। তারপর রাসিক কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। এতে তিনি বর্তমান আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। রাজস্ব বিভাগকে তিনি ধরাকে সরাজ্ঞান করে কুক্ষিগত করে রেখেছেন। এ বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারিররা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। বিপরীতে এই রাজস্ব কর্মকর্তাই কর্মচারিদের নানানভাবে হয়রানি করছেন।

জানা গেছে, রাসিকের সাবেক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটনের ফুপাতো ভাই আবু সালেহ নুর-ই-সাইদ। তিনি মেয়রের সুবাদে ২০১০ সালে রাজস্ব কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পান। এরপর থেকে তিনি রাসিকে খবরদারি শুরু করেন। একের পর এক অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। রাসিক মেয়রের ক্ষমতায় তিনি বিগত ১৪ বছর রাজস্ব বিভাগকে নিজের মত ব্যবহার করে আসছেন। পতিত হাসিনা সরকার ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পালিয়ে যাওয়ার পরও তিনি দাপটের সাথেই রাজস্ব বিভাগ পরিচালনা করছেন। তাকে অপসরণের দাবি তোলা হলেও অপসরণ করা হয়নি। এমন কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি। এই রাজস্ব কর্মকর্তার অনিয়ম দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতার ব্যাপারে সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলেও কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করছেন।

জানা গেছে, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ নুর-ই-সাইদ রাসিকের সাবেক মেয়র লিটনের সাথে এখনো যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। তিনি নিয়মিত মেয়র লিটনকে রাসিকের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করছেন। এমন কি সাবেক মেয়র ও তার পরিবারকে অর্থ দেয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব বিষয় নিয়ে রীতিমত রাসিকে নানান গুঞ্জন রয়েছে। হচ্ছে নানান আলোচনা ও তাকে অপসরণ না করায় রাসিক কর্তৃপক্ষকে নিয়ে চলছে সমালোচনা। এতো কিছুর পরও তার বহাল তবিয়তে থাকার বিষয়টি খুব ভাল চোখে দেখছে না রাসিক কর্মচারি থেকে শুরু করে সুধি মহল।

জানা গেছে, এই রাজস্ব কর্মকর্তা এতোটাই ক্ষমতা ধর ছিলেন যে আওয়ামী লীগের সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জোরপূর্বক আওয়ামী লীগের দলীয় অনুষ্ঠান, মিছিল-মিটিং অংশ নিতে বাধ্য করতেন। কোনো কর্মচারি মিটিং মিছিলে না গেছে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা, অফিস আদেশে শাস্তি দেয়াসহ নানান হয়রানি করা হতো। এমন কি তার সহযোগিতায় রাসিক মেয়র লিটন আধিপত্য বিস্তারের জন্য রাসিকের বিভিন্ন বিভাগ ও শাখায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের ক্যাডারদের অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেন। আর নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মচারিরা আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা ব্যবহার হলেও প্রতি মাসে রাজস্ব খাত থেকে তাদের বেতন ভাতা দেয়া হতো। এই রাজস্ব কর্মকর্তার সহযোগিতায় রাসিকে এতোটাই জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছিল যে ক্যাডার নিয়োগ দিয়ে বেতনভাতা দেয়ার জন্য বর্তমান রাসিকের রাজস্ব খাতের অবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না এই খাতটি। মূলত জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য এই রাজস্ব কর্মকর্তা নগর ভবনকে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ দিয়েছিলেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভাড়াটে ক্যাডার এনে নগর ভবনের গেস্ট হাউস ও শহরের নামী-দামী আবাসিক হোটেলে রাখা হয়। কথিত আছে, তাদের মনোরঞ্জনের জন্য নগর ভবনে মহিলাদের ব্যবস্থা করা হতো। আর এতে যা ব্যয় হতো তা রাসিকের রাজস্ব থেকে দেয়া হতো।

জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে জড়িত থাকার অভিযোগে রাসিকের যে ক’জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছিল তার মধ্যে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা অন্যতম। তিনি ছিলেন মূলত মাস্টারমাইন্ড। এতো কিছুর পরও রাসিক কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। প্রশ্ন উঠেছে কার ইশারায় বা কোন অদৃশ্য ক্ষমতা বলে তিনি এখনো রাসিকে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। বারবার কর্তৃপক্ষ বলছে রাজস্ব কর্মকর্তার বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না কেনো?

এ ব্যাপারে রাসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ নুর-ই-সাইদ বলেন, আমি একজন কর্মকর্তা হিসাবে যখন যে মেয়র থাকবে তখন তার অধিনস্ত কাজ করবো এটাই স্বাভাবিক। আমি কোনো অনিয়ম বা স্বেচ্ছাচারিতার সাথে জড়িত নই। এমন কি মেয়র লিটনের সাথেও আমার কোনো যোগাযোগ নেই। একটি মহল আমাকে নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

বিষয়টি নিয়ে রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিমের (উপ-সচিব) সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলা হলে তিনি বলেন, আমি প্রশাসকের সাথে মিটিংয়ে আছি। পরে কথা বলবো। রাসিকের প্রশাসক ড. আ.ন.ম বজলুর রশীদের সাথে তার ব্যবহৃত মোবাইলে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট