নওগাঁর কীত্তিপুরে অস্ত্রের মুখে অপহরণ, ২৫ দিনেও সন্ধান মেলেনি চমকের
নওগাঁ প্রতিনিধি
নওগাঁয় দিনদুপুরে বাড়িতে ঢুকে অস্ত্রের মুখে এক নারীকে অচেতন করে মাইক্রোবাসে তুলে অপহরণের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার ২৫ দিন পেরিয়ে গেলেও হাবিবা ইয়াসমিন চমক (৩০) নামে ওই নারীর কোনো সন্ধান মেলেনি। মেয়েকে ফিরে পেতে সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও ব্যর্থ হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তার বাবা। এদিকে দীর্ঘদিনেও মেয়ের সন্ধান না পাওয়ায় চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের।
স্বজনদের আশঙ্কা, অপহরণের পর চমককে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে। এমনকি তাকে পাচার কিংবা হত্যার পর মরদেহ গুম করা হয়ে থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা। তবে এসব আশঙ্কার সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় গত ২২ সেপ্টেম্বর নওগাঁর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ মামলা করেছেন ভুক্তভোগীর বাবা দুলাল হোসেন (৫৯)। তিনি সদর উপজেলার কীর্ত্তিপুর ইউনিয়নের কীর্ত্তিপুর (নূরাপাড়া) গ্রামের বাসিন্দা। মামলার নম্বর ১৫০/২০২৬ (নাঃ শিঃ)।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭/৯(১)/৩০ ধারায় দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি জেলার বদলগাছী উপজেলার আধাইপুর ইউনিয়নের কার্তিকাহার (মিস্ত্রীপাড়া) গ্রামের পিন্টু হোসেনের ছেলে রিয়াদ হোসেনকে (২৮)। অন্য আসামিরা হলেন রিয়াদের ভাই মাহবুব হোসেন (২৪), বাবা পিন্টু হোসেন (৫৫), মা রোকেয়া বেগম এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও চার-পাঁচজন।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, হাবিবা ইয়াসমিন চমককে দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন অভিযুক্ত রিয়াদ হোসেন। কিন্তু চমক তার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাকে নানাভাবে উত্ত্যক্ত ও হয়রানি করা হতো। একপর্যায়ে চমকের বিয়ে হলেও রিয়াদ তাকে উত্ত্যক্ত করা বন্ধ করেননি। বাদীর অভিযোগ, রিয়াদের অব্যাহত হয়রানি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে চমকের প্রথম সংসার ভেঙে যায়। এরপরও তাকে বিভিন্নভাবে বিরক্ত ও হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।
মামলার বিবরণে জানাযায় গত ২০ সেপ্টেম্বর রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চমকের বাবা দুলাল হোসেন ও তার ভাই কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ির বাইরে যান। ওই সময় বাড়িতে চমক ও তার মা অবস্থান করছিলেন। এ সুযোগে অভিযুক্ত রিয়াদ তার পরিবারের সদস্য ও সহযোগীদের নিয়ে একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাসে করে তাদের বাড়িতে হাজির হন।
অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্তরা রামদা, চাকু, ছোরা ও লোহার রডসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে জোরপূর্বক বাড়িতে প্রবেশ করেন। এরপর অস্ত্রের মুখে মা-মেয়েকে জিম্মি করে চমককে টেনেহিঁচড়ে বাড়ি থেকে বের করে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় মা-মেয়ে চিৎকার শুরু করলে তাদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে অভিযুক্ত রিয়াদ চেতনানাশক ওষুধ মেশানো রুমাল দিয়ে চমকের মুখ চেপে ধরলে এতে চমক অচেতন হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত মাইক্রোবাসে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যান।
ঘটনার পর মেয়েকে উদ্ধারের আশায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে অভিযুক্তদের বাড়িতে যান দুলাল হোসেন। কিন্তু সেখানে মেয়ের সন্ধান পাওয়ার পরিবর্তে উল্টো মারধর, হত্যা ও মরদেহ গুম করার হুমকি দেওয়া হয় বলে মামলায় অভিযোগ করেছেন তিনি।
বাদীর দাবি, ঘটনার পরদিন ২১ সেপ্টেম্বর সকালে নওগাঁ সদর মডেল থানায় মামলা করতে যান তিনি। কিন্তু থানা পুলিশ মামলা গ্রহণ না করে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। পরে নিরুপায় হয়ে ২২ সেপ্টেম্বর নওগাঁর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ মামলা দায়ের করেন।
এদিকে ঘটনার ২৫ দিন অতিবাহিত হলেও চমকের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। প্রতিদিন মেয়ের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন বাবা-মা। কোথায় আছেন চমক, কেমন আছেন, আদৌ বেঁচে আছেন কি না—এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে স্বজনদের মনে।
মেয়ের সন্ধান না পেয়ে অসহায় বাবা দুলাল হোসেন বলেন, ‘আমার মেয়েকে দিনদুপুরে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে। ২৫ দিন হয়ে গেল, এখনো তার কোনো খোঁজ পাইনি। কোথায় রেখেছে, কী অবস্থায় আছে, কিছুই জানি না। আসামিরা আমার মেয়েকে আটকে রেখে নির্যাতন করছে, নাকি মেরে লাশ গুম করেছে, সেই আতঙ্কে দিন কাটছে আমাদের।’
তিনি আরও বলেন, ‘মেয়েকে ফিরে পেতে অনেকের কাছে গিয়েছি। কোথাও কোনো সমাধান পাইনি। শেষ পর্যন্ত আদালতে মামলা করেছি। আমি আমার মেয়েকে জীবিত ফিরে পেতে চাই। প্রশাসনের কাছে একটাই দাবি, দ্রুত আমার মেয়েকে উদ্ধার করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হোক।’
এ বিষয়ে নওগাঁ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান জানান, ভুক্তভোগীর পরিবার থানায় আসার পর তাদের আইনগত পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে। আদালতের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা বা আদেশ হাতে পেলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
