আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে হবে
দেশে প্রায় প্রতিদিন যেসব অপরাধমূলক ঘটনা ঘটছে, তাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল বলা যায় না। দেশের কোথাও না কোথাও এই অপরাধের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে সামাজিক অপরাধ যেমন রয়েছে, তেমনি ঠুনকো বিষয় নিয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। গতকাল ইংরেজি দৈনিক নিউ এজের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, লালমনিরহাটে উপজাতিদের বিষয় নিয়ে তর্কবিতর্কের জেরে ১৭ বছরের এক কিশোরকে এক ব্যক্তি পিটিয়ে হত্যা করে। বগুড়ার শেরপুরে উচ্চ সুদে নেয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারা নিয়ে ঋণদাতা এক ব্যক্তিকে পিটানোর সময় তার বড় ভাই ৬৪ বছর বয়স্ক ব্যক্তি ঠেকাতে গেলে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। অন্যদিকে দেনিক ইনকিলাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৯ অক্টোবর খুলনা মহানগরিতে সার্কেল অফিসে কর্মরত এক পুলিশ পরিদর্শককে ছিনতাইকারিরা হাতের কবজিতে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। গত শুক্রবার কুমিল্লায় সালিশি বৈঠকে যাওয়ার সময় এক যুবদল নেতাকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করে। গত বৃহস্পতিবার নেত্রকোনার দুর্গাপুরে এক সাংবাদিককে দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করে। এসব ঘটনায় বোঝা যাচ্ছে, মানুষের মধ্যে যেমন অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি দুর্বৃত্তরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অপরাধীদের হাত থেকে সাধারণ মানুষসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যও রেহাই পাচ্ছে না। অন্যদিকে, গতকাল দৈনিক যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে বিশেষ করে গ্যাং হাবে পরিণত হওয়া উত্তরায় কিশোর গ্যাং দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাদের দমাতে পারছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সাইবার অপরাধ এতটাই বেড়েছে যে, তা থেকে কেউই রেহাই পাচ্ছে না। দেশে অপরাধ দমন ও প্রতিকারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আদালত সক্রিয় রয়েছে। তবে সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূলে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালত যথেষ্ট নয়। এর জন্য পারিবারিক ও সামাজিক রীতিনীতি, শাসনবারণ, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, ধর্মীয় অনুশাসনের গুরুত্ব অপরিসীম। এসবের অবক্ষয় বা ঘাটতি দেখা দিলে পরিবার ও সমাজে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি, তাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতার পাশাপাশি পারিবারিক, সামাজিক ও র্ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয় যুক্ত হয়ে অসহিষ্ণুতা তৈরি হয়েছে। জনমনে নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একেকটি ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। এসব ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিদেশিরাও এসব ঘটনা দেখে বাংলাদেশকে অনিরাপদ ভাবে। এতে বিনিয়োগকারিদের মধ্যে দ্বিধা ও সংশয় জন্মাচ্ছে। বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পুর্নোদ্যমে সক্রিয় হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে ব্যাপক উদ্দীপনামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারি দল হিসেবে বিএনপির দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। দেশের সর্বত্র দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। এর মাধ্যমে অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণে দলীয়ভাবে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে জনসচেতনতার উদ্যোগ নেয়া উচিৎ। স্ব স্ব এলাকায় পরিবারিক, সমাজিক মূল্যবোধ বৃদ্ধিতে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। নিজেরা অপরাধ থেকে মুক্ত থাকবে, অন্যদেরও অপরাধ থেকে মুক্ত থাকতে প্রেরণাদায়ক কর্মসূচি নিতে হবে। আলেম, ওলামা, পীর, মাশায়েখ, মসজিদের ইমামদেরও পারিবারিক, সামাজিক ও র্র্ধর্মীয় মূল্যবোধ বৃদ্ধিতে বয়ান কার্যক্রম বৃদ্ধি করা উচিৎ। আইন যাতে কেউ নিজের হাতে তুলে না নেয়, এ ব্যাপারে সতর্ক ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম নিতে হবে। অপরাধীর প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কোনো ধরনের অনুকম্পা দেখানো যাবে না। অপরাধী যত বড় হোক না কেন, তার রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান দেখে ছাড় দেয়া যাবে না। অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। আইন-আদালতের মাধ্যমে অপরাধীর সাজা নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধ দমনে এবং অপরাধ প্রবণতা ঠেকাতে সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।
