সম্পাদকীয়

বেসরকারি খাতে স্থবিরতা রোধে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে

বেসরকারি খাতকে মনে করা হয় একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন নতুন কলকারখানা তৈরি, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং রাজস্ব আয়ে বেসরকারি খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে হতাশার দিক হলো, আমাদের দেশের বেসরকারি খাত কাঙ্ক্ষিত গতি অর্জন করতে পারছে না। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকে আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়েনি। বিনিয়োগেও গতি ফেরেনি। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় এসব চিত্র উঠে এসেছে গতকাল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত খবরে। জিইডির প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়, আগস্ট মাসে ব্যাংক খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল ১১.৯৬ শতাংশ। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে এই হার ছিল ৬.৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকে আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধি কমেছে। এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। একই সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নের হার মাত্র ১.৮৫ শতাংশ। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকায় চাপে রয়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। রপ্তানি আয় কমে যাওয়াও অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনেও দেশের অর্থনীতি নিয়ে বেশ কিছু উদ্বেগের দিক সামনে আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩.৪ শতাংশ। একই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এই প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ২.২ শতাংশের ঘরে। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে এটিই সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ০.৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ০.৭ শতাংশ কমেছে। একই সময় পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি কমেছে ৪.৮ শতাংশ। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে অনেক কারখানা সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে। নিকট অতীতে চোখ ফেরালে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাননি। বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে অনেক আশার কথা শোনানো হলেও বাস্তবে তার কিছুই পাওয়া যায়নি। মব সংস্কৃতির কারণে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে। এসবের  প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। সেই সময় আশা করা হয়েছিল, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে। আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে, বিনিয়োগও বাড়বে। নতুন সরকার আসার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বটে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ এখনো আসেনি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটি দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অর্থনীতিতে গতি বৃদ্ধির জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশে বিনিয়োগ না বাড়ার অন্যতম কারণ অনুকূল পরিবেশের অভাব। বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত না হলে অর্থনীতিতে গতি ফেরানো কঠিন হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে একসঙ্গে অনেক উদ্যোগ না নিয়ে ছয়-সাতটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ কার্যকর করে দেখানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বেসরকারি খাত চাঙ্গা করতে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে প্রত্যাশিত ফল আসবে না, এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ আমলে নিতে হবে। প্রাথমিকভাবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো জরুরি। একই সঙ্গে অনিয়ম বন্ধে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আশা করি বর্তমান সরকার চলমান পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক কর্ম-কৌশল গ্রহণ করবে এবং দেশের অর্থনীতিতে গতি ফিরে আসবে।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট