সম্পাদকীয়

তথ্য ফাঁসরোধে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে

প্রযুক্তির প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উদ্ভাবন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কর্মকাণ্ড ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে যেমন সহজ করে দিয়েছে এবং দিচ্ছে, তেমনি মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলে কিছু থাকছে না। মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের কর্মকাণ্ডও গোপন থাকছে না। তাদের ব্যক্তিগতসহ দায়িত্ব সংক্রান্ত সব তথ্যই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। চাইলেই এসব তথ্য মুহূর্তে পাওয়া যাচ্ছে। তথ্যফাঁস করার জন্য রীতিমতো ওয়েবসাইট খুলে নিবন্ধনের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপি ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের তথ্য সরবরাহ করছে সাইবার অপরাধীরা। গত ১০ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দৈনিক প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তথ্য ফাঁসের এই ভয়াবহ ও ভয়ংকর চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মানুষ মুঠোফোনে কার সঙ্গে কথা বলে, কী বার্তা পাঠায়, কোথায় কোথায় যায়, এসব তথ্য টাকা দিলেই পাওয়া যায়। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বহুদিন ধরে এসব তথ্য বিক্রি করা হচ্ছে। যারা তথ্য বিক্রি করেন, তাদের কাছে গত ৬ সেপ্টেম্বর একজন মন্ত্রীর মোবাইল নম্বর পাঠিয়ে তার তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছিল। দেয়া হয়েছিল তাদের দাবি করা টাকা। কয়েক ঘণ্টা পরই পাওয়া যায় সেই মন্ত্রীর মুঠোফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর)। সিডিআরে দেখা যায়, মন্ত্রী তিন মাসে কার সঙ্গে কত সময় কথা বলেছেন, কখন কথা বলেছেন, কথা বলার সময় তিনি কোথায় অবস্থান করেছেন ইত্যাদি নানা গোপন তথ্য রয়েছে। সিডিআর আসল কিনা, তা মন্ত্রীকে দেখানোর পর তিনি নিজের মোবাইল ফোন বের করে মিলিয়ে অবাক হয়ে বলেন, ‘এটা কীভাবে সম্ভব! তাহলে তো কেউ নিরাপদ নয়।’ শুধু মন্ত্রী নন, তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার দুজন প্রধানের মুঠোফোন নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ করে মিলিয়ে দেখা যায়, তাদেরগুলোও সঠিক। প্রতিবদেনে বলা হয়, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের তথ্য নিরাপদ নয়। এমনকি যাদের দায়িত্ব মানুষকে নিরাপদ রাখা, তাদের গোপন তথ্যও ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। মুঠোফোনের গোপন তথ্য কেনাবেচাকে ঘিরে অনলাইনে একটি বাজার গড়ে উঠেছে। ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে, ওয়েবসাইট খুলে এবং টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে এসব তথ্য বিক্রি হচ্ছে। টাকা দিলেই পাওয়া যাচ্ছে ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র, সিডিআর, মুঠোফোনের অবস্থান, এসএমএস, টিআইএন সনদ, পাসপোর্টের তথ্য ও মুঠোফোনে লেনদেনের আর্থিক বিবরণী। কারও তিন মাসের সিডিআর কিনতে চাইলে খরচ ১ হাজার ৫০ টাকা। ছয় মাসের সিডিআরের দাম ১২০০ টাকা। এসব ওয়েবসাইট যারা পরিচালনা করেন, তারা ক্রেতাদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ খুলে বার্তা আদান-প্রদান করেন। এ এক ভয়াবহ চিত্র। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যফাঁস তাদের জীবনকে অনিরাপদ করে তুলেছে। সবকিছু এখন ডিজিটাল বা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়ায় বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে একজন সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দিতে হয়। মোবাইল সিম, পাসপোর্ট, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, জমি বেচাকেনার রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে যেকোনো কাজে ব্যক্তি ও পারিবারিক তথ্যসহ আঙ্গুলের ছাপ, চোখের রেটিনা, মুখের ছাপ দেয়া অপরিহার্যতায় পরিণত হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সব প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কাজের তথ্যও ডিজিটালি সংগ্রহ করা হয়। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের অতি গোপনীয় নথি কিংবা প্রতিবেদনও সংরক্ষণ করা হয়। দেখা যায়, এসব অতি গোপণীয় তথ্য ও প্রতিবেদনও গোপন থাকছে না। সাইবার অপরাধীরা অর্থ বা নিজ স্বার্থে প্রকাশ করে দিচ্ছে। এতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে দৈনিক ইনকিলাবের এক প্রতিবেদনে সাবমেরিন কেবলের সাথে প্রতিবেশি একটি দেশের সম্পৃক্ততা থাকায়, তার মাধ্যমে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চলে যাওয়ার কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রযুক্তির যথাযথ সুরক্ষার অভাবে রাষ্ট্রের গোপন তথ্য বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে চলে যাচ্ছে কিংবা চলে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যেখানে রাষ্ট্রের সাইবার সুরক্ষা শক্তিশালী নয়, সেখানে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও অন্যকোনো ডিভাইস থেকে মন্ত্রী-এমপি বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিসহ সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গোপন তথ্য ফাঁস হওয়া কোনো ব্যাপারের মধ্যে পড়ে না। মানুষের মুঠোফোনের গোপন তথ্য ফাঁস নিয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে বিক্রি করা ও ফাঁস হওয়া চলতে দেয়া যায় না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত এই চক্রকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে সরকার কাজ করছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, শুধু কথার কথা বললে হবে না, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে সিরিয়াস উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিনিয়ত কাজ করে মানুষের সাইবার সুরক্ষা দিতে হবে। রাষ্ট্র হচ্ছে, মানুষের তথ্য সংরক্ষণের সিন্ধুক স্বরূপ। এ সিন্ধুকের চাবি শুধু রাষ্ট্রের হাতে থাকবে, যাতে অন্য কেউ খুলতে না পারে। রাষ্ট্রের কাছে দেয়া নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য রাষ্ট্রের আমানত। এ আমানত রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আমরা দেখছি, এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের ঢিলেঢালা ভাব ও উদাসীনতা রয়েছে, যা মোটেই কাম্য নয়। প্রযুক্তির কাছে রাষ্ট্রকে অসহায়ত্ব প্রকাশ করলে চলবে না। যারা তথ্য ফাঁস করে, রাষ্ট্রকে তাদের চেয়ে বহুগুণে এগিয়ে থাকতে হবে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে রাষ্ট্রকে যেমন নাগরিকদের সচেতন করতে হবে, তেমনি তথ্য সুরক্ষার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ এবং তথ্য ফাঁসকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
 

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট