সম্পাদকীয়

পর্যটকদের সব ধরনের নিরাপত্তা দিতে হবে

দেশে সাধারণত শীতকালকে পর্যটনের মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শীত পেরিয়ে বর্ষার আগ পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রগুলো পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে। পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধব মিলে দল বেঁধে দেশের আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে বেড়াতে ও আনন্দে সময় কাটাতে যায়। আমাদের দেশের মতো পর্যটনকেন্দ্রের বৈচিত্র অনেক উন্নত দেশেও নেই। এখানে যেমন বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত (প্রায় ১২০ কিলোমিটার) অখণ্ড প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্র এবং এর তীর ঘেঁষে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে অপূর্ব ম্যারিন ড্রাইভ রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বা লবণাক্ত বনাঞ্চল সমৃদ্ধ সুন্দরবন। আবার কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত যেখানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। এমন সমুদ্র সৈকত বিশ্বে আর কোথাও নেই। এমন বিরল পর্যটনকেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও আমরা সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার করতে পারছি না। শুধু এসব পর্যটনকেন্দ্রই নয়, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র এতটাই সমৃদ্ধ, যাতে রয়েছে একদিকে সবুজ-শ্যামল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমতলভূমি, অন্যদিকে অপূর্ব প্রাকৃতিক শোভামণ্ডিহ পাহাড়। যারা পাহাড় ও তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে চান, তারা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, সিলেট, ময়মনসিংহ ইত্যাদি জেলাগুলোতে বেড়াতে যান। যারা সুমুদ্র এবং একমাত্র কোরাল দ্বীপ সেন্টমার্টি যেতে চান, তারা কক্সবাজার যান। পর্যটনের সবচেয়ে বড় এবং আকর্ষণীয় স্থান হচ্ছে কক্সবাজার। এখানে বছরে গড়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটে। এ সংখ্যা বছরে এক কোটিতে উন্নীত করতে এ বছর তিনমাস ধরে বীচ কার্নিভালের আয়োজন করা হয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। এখানে রয়েছে পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল। ম্যারিন ড্রাইভের আশপাশে ২০০ থেকে ২৫০ টি স্থায়ী হোটেল-মোটেলসহ প্রায় আড়াই হাজার অস্থায়ী রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবানসহ অন্যান্য পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতেও বিভিন্ন ধরনের রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এই পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে ঘিরে রেস্টুরেন্ট, পোশাক, ফলফলাদির দোকানসহ বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক চেইন গড়ে উঠেছে, যা ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান করছে এবং তা সম্প্রসারিত করার সম্ভাবনাকে এগিয়ে নিচ্ছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটক আকর্ষণ করার অন্যতম শর্ত হচ্ছে, মসৃণ যাতায়াত ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা। বলা বাহুল্য, এই দুই ব্যবস্থায়ই চরম ঘাটতি রয়েছে। পর্যটকরা যে আনন্দভ্রমণে নিশ্চিন্তে সময় কাটাতে কেন্দ্রগুলোতে যাবে, এ ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারে না। মনে শঙ্কা ও ভয় নিয়েই যায়। সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষকে অনেক সময় বড় বড় কথা বলতে শোনা গেলেও পর্যটকদের শঙ্কা ও ভয় কাটানোর কোনো স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা করতে দেখা যায় না। সামনে যে পর্যটন মৌসুম পুরোপুরিভাবে শুরু হবে এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে লাখ লাখ পর্যটকের ঢল নামবে, তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা জোরদার ও যাতায়াতের পথ মসৃণ করা হয়েছে বা হচ্ছে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অনেক পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ার সড়ক ব্যবস্থা এখনো ভাঙাচোড়া অবস্থায় রয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রে যেতে যেতেই তাদের নির্ধারিত বেড়ানোর সময় থেকে অনেকটা সময় চলে যায়। পর্যটনকেন্দ্রে গিয়ে তারা নিরাপত্তা শঙ্কায়ও ভোগে। ট্যুরিস্ট পুলিশ থাকলেও তাদের কর্মতৎপরতায় শৈথিল্য পরিলক্ষিত হয়। পর্যটনকেন্দ্রে স্থানীয় সন্ত্রাসী ও মাস্তানদের আনাগোনা থাকে। অনেক সময় তাদের দ্বারা পর্যটকদের হেনস্তা ও নাজেহাল হতে হয়। এছাড়া ঠগ ও ছিনতাইকারিদের উৎপাতও থাকে। ফলে পর্যটনকেন্দ্রে বেড়াতে গিয়ে পর্যটকরা দিন-রাত যে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াবে, এমন নিশ্চয়তা পায় না। পর্যবেক্ষকদের মতে, পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই পর্যটকরা যাতে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সহজে যাতায়াত করতে পারে, এজন্য সড়ক দ্রুত সংস্কার করতে হবে। এই পূজার ছুটিতে সড়ক সংস্কারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সময়ে সড়কের যেখানে যেখানে মেরামত করা দরকার, তা দ্রুত মেরামত করে ফেলতে হবে। পর্যটনকেন্দ্রে গিয়ে পর্যটকরা যাতে নিশ্চিন্তে দিন-রাত ইচ্ছামতো মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াতে পারে, এজন্য ট্যুরিস্ট পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। অবাঞ্চিত লোকজনের উৎপাত ঠেকাতে পুলিশকে সার্বক্ষণিক টহল ও নজরদারি থাকতে হবে, যাতে কোনো পর্যটক সমস্যার সম্মুখীন হলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেয়া যায়। পর্যটকদের যাতায়াত থেকে শুরু করে পর্যটনকেন্দ্রে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যত ধরনের পদক্ষেপ নেয়া দরকার, সেটাই নিতে হবে।
 

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট