সম্পাদকীয়

উদ্বেগ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে

সাম্প্রতিক সময়ে পত্রপত্রিকাজুড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে এমনসব ঘটনা উঠে এসেছে, যার মাধ্যমে আমাদের সমাজের নীতি- নৈতিকতা, মূল্যবোধ, পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের কতটা অবক্ষয় ঘটেছে, তার একটি চিত্র পাওয়া যায়। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে, পারিবারিক অশান্তির কারণে তিন সন্তানকে নিয়ে স্বামীর বিষপান, ঘরের মধ্যে একই পরিবারের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানের রহস্যজনক মৃত্যু, যৌতুকের দাবির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় স্ত্রীর ভাইকে পিটিয়ে জখম করা, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়ে তরুণীর মৃত্যু ইত্যাদি। এসব ঘটনার পাশাপাশি গতকাল দেশজুড়ে যে দুটি ঘটনা নিয়ে তোলপাড় হয়েছে, তা হচ্ছে, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ১৩ বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ইশরাত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন পাহড়ে লাশ পাওয়া এবং ভাত খাওয়াকে কেন্দ্র করে খুলনার নর্থ ওয়ের্স্টান ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী আজমল হোসেনকে নির্যাতন ও ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, অপ্রতিমকে তার কাছে থাকা মায়ের আইফোন দিয়ে ছবি তোলার নাম করে সন্দেহভাজন কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্য ডেকে নিয়ে হত্যা করেছে। তার আগে অপ্রতিমকে খুঁজে না পেয়ে তার মা ফেসবুকে তার খোঁজ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে পোস্ট দিয়েছিলেন। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হয়ে তার সন্ধানে নামে। শেষ পর্যন্ত পাহাড়ে তার লাশ খুঁজে পাওয়া যায়। এ ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। অপ্রতিমকে হত্যার পেছনে প্রাথমিকভাবে আইফোন ছিনিয়ে নেয়ার কথা বলা হলেও এর পেছনে আরও কোনো কারণ রয়েছে কিনা, তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে। অন্যদিকে খুলনার ঘটনায় শিক্ষার্থী আজমল মেসে থাকতেন। মেসে খাবে কিনা, তা দুই ঘন্টা আগে জানাতে হয়। আজমল তা না জানিয়ে অন্যের ভাত খেয়ে ফেলায় মেসের অন্যান্য সদস্যরা তাকে মারধর করে ছাদে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে অকথ্য নির্যাতন করে এবং ছাদ থেকে পড়ে তার মৃত্যু হয়। প্রত্যেক দেশের সমাজে কমবেশি অপরাধ ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে থাকে। তবে তার বৃদ্ধি রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকার চেয়ে পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ ও ধর্মীয় অনুশাসন সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের পরিবার ও সমাজ মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত। তবে বিগত বছরগুলোতে এর অবনমন ও অবক্ষয় সচেতন মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। উল্লেখিত ঘটনাগুলো জনমনে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের সমাজ যেন ‘লোভী সমাজে’ পরিণত হয়েছে। পারস্পরিক সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও সহাবস্থান দুর্বল হয়ে গেছে। এর জন্য রাষ্ট্র পরিচালকদের দায় রয়েছে। তারা উন্নয়নের পেছনে ছুটতে গিয়ে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবনমনের দিকটি উপেক্ষা করে যাচ্ছে। নীতি-নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধের উন্নয়নের কথা না বলে কেবল বড় বড় প্রকল্প এবং প্রযুক্তির উন্নয়নের কথা বলছে। তরুণ প্রজন্মের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যে উচ্ছন্নে যাচ্ছে, সেদিকে খেয়াল নেই। বলার অপেক্ষা রাখে না, সমাজকে বিশৃঙ্খল রেখে কোনো উন্নয়নই কাজে আসে না। উন্নয়নকে কল্যাণে পরিণত করতে হলে সমাজকে সুশৃঙ্খল করার উদ্যোগের বিকল্প নেই। সরকারের উচিৎ, পারিবারিক ও সামাজিক নীতি-নৈতিকতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয় ঠেকাতে এবং দৃঢ় করতে বিশেষ পরিকল্পনা ও সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেয়া। দেশের আলেম সমাজসহ সমাজবিদদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে গাইডলাইন তৈরি করে, তা সকল প্রচার মাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করা। পরিবার ও সমাজে মোটিভেশনাল কার্যক্রম শুরু করা। জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নৈতিকমূল্যবোধ গঠনে স্ব স্ব এলাকায় উদ্দীপনামূলক ভূমিকা রাখতে হবে। সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি যেন অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। সরকারকে এক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। অপরাধীকে দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এর পুনরাবৃত্তি না হয়। যেকোনো মূল্যে সকল অপরাধের মূল উৎস মাদক নির্মূল করতে হবে।
 

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট