আগামী পাঁচ বছরে দেশের অর্থনীতিকে উন্নত করা সম্ভব
দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যে ভবিষ্যতের একটি সুসংবাদ দিয়েছে আর্ন্তজাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি বাংলাদেশের অর্থনীতির পূর্বাভাস দিয়ে বলেছে, আগামী পাঁচ বছর বা ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৬৭৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে যাবে। কানাডার সংবাদমাধ্যম ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের ‘দ্য ১৫০ ডলার গ্লোবাল ইকোনোমি ইন ২০৩০’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এ তথ্য দেশের হতাশাজনক অর্থনীতির মধ্যে আশাব্যঞ্জক। এ থেকে প্রেরণা ও অনুপ্রেরণা পাওয়া যেতে পারে। তবে এটা আশা করে বসে থাকলে হবে না। সঠিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, উদ্যোগ এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন ছাড়া উন্নয়ন এমনি এমনি হয়ে যাবে না। মিথ্যা ও বানোয়াট পরিসংখ্যান প্রকাশ করে উন্নয়নের গালগল্প করলেও চলবে না, যেমনটি আমরা দেখেছি পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে। তখন মিথ্যা পরিসংখ্যানের ফানুস উড়িয়ে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেয়া হয়েছিল। তার পতনের পর দেখা গেল, অর্থনীতি তলাবিহীন ঝুড়ি হয়ে রয়েছে। কর্মজীবীদের কর্মঘন্টা যেমন নষ্ট হয়, তেমনি কাজের গতিও কমে যায়। দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা কেমন, তা সকলেরই জানা। রেল ও নৌপথের যোগাযোগ ব্যবস্থাও অজানা নয়। সড়ক, রেল ও নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের সমন্বয় দেখা যায় না। যুগের পর যুগ ধরে এই সমন্বয়হীনতা চলে আসছে। অথচ এই তিন পথের যদি সমন্বয় বা একটির সাথে আরেকটির মসৃণ চেইন লিংক থাকে, তাহলে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থাই সহজ হয়ে যায়। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম যে উন্নতি করছে, তার অন্যতম কারণ হচ্ছে, এই তিন পথের সমন্বয়ের কারণে। তিন পথেই তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা যথেষ্ট উন্নত। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হচ্ছে, বিনিয়োগ ও উৎপাদন। এই বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত গ্যাস-বিদ্যুৎ এবং মসৃণ যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রধান শর্ত। দেশের চলমান বিনিয়োগ চিত্র সন্তোষজনক নয়। মূলত গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট বিনিয়োগকারিদের নিরুৎসাহী করছে। বিনিয়োগ করে যদি জ্বালানি সংকটে উৎপাদনে যেতে না পারে, তাহলে বিনিয়োগকারিরা কেন বিনিয়োগ করবে? অন্যদিকে, যোগাযোগ ব্যবস্থা মসৃণ বা সমন্বিত না থাকলে উৎপাদিত পণ্য যথাসময়ে কীভাবে রপ্তানি করবে? বিভিন্ন দাতা সংস্থার সহযোগিতা ও বিনিয়োগ এলেও তা কাজে লাগানোর দক্ষতা ও সক্ষমতার অভাব এবং দুর্নীতির কারণে ফেরত নিয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে বিশ্ব ব্যাংক ওয়েস্টার্ন ইকোনোমিক করিডোর অ্যান্ড রিজিওনাল এনহ্যান্সমেন্ট প্রকল্পের প্রথম ধাপের জন্য বরাদ্দকৃত ঋণ থেকে ৩৩৫ মিলিয়ন ডলার ফেরত নিয়ে গেছে। প্রকল্পের কাজের ধীরগতি এবং সময়মতো বাস্তবায়নের ব্যর্থতার কারণে এই অর্থ ফেরত নিয়ে যায়। এটা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের নেতিবাচক ঘটনা। এ ধরনের ব্যর্থতার ঘটনা ঘটলে উন্নয়ন হবে কীভাবে? এছাড়া, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক নানা জটিলতাও উন্নয়নের গতিকে ধীর করে দিচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে অর্থনীতিতে দেশ মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে ছাড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। এজন্য প্রয়োজন সরকারের কার্যকর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য স্বি স্তদায়ক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। এজন্য সহজলভ্য জ্বালানি এবং সড়ক, রেল ও নৌ যোগাযোগের সমন্বিত ব্যবস্থা করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যাতে যথাসময়ে সম্পন্ন করা যায়, এজন্য দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের মতো লুটপাট ও দুর্নীতি করার জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না। কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য বন্ধ কলকারখানা চালু ও নতুন কারখানা স্থাপনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। অস্বীকার করার উপায় নেই, ইরানযুদ্ধ পুরো বিশ্বের অর্থনীতিকে টালমাটাল করে দিয়েছে। বাংলাদেশও এর মধ্যে পড়েছে। এমতাবস্থায়, কীভাবে অর্থনীতিকে দ্রুত উন্নয়ন করা যায়, তা নিয়ে দেশের অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া উচিৎ। এতে সংকট মোকাবেলা করে সমাধানের পথও বের হবে। কয়েক বছর আগে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিক থাকলে এশিয়ার চার দেশ হংকং, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের পর এশিয়ার পঞ্চম টাইগারে পরিণত হবে। ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে তা হয়নি। তবে আইএমএফ যে পূর্বাভাস দিয়েছে, তাতে আশা করা যায়, বর্তমান সরকার অর্থনীতির সঠিক পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন করতে পারলে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে। এজন্য বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং পর্যাপ্ত জ্বালানি এবং সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা অপরিহার্য। পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনসহ দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে।
