ভাইয়ে ভাইয়ে সংঘাত কেন?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দেশব্যাপী পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করছে। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার হবিগঞ্জে নেতাকর্মীদের বহরে হামলা হয়। এতে এনসিপির হবিগঞ্জের এক সংগঠকের বাঁ চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার জন্য এনসিপি স্থানীয় ছাত্রদলকে দায়ি করেছে। দলটি ছাত্রদলের সভাপতিকে প্রধান আসামি করাসহ অজ্ঞাতনামা ১০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। পরদিন সিলেটে এনসিপির পদযাত্রা কর্মসূচির গাড়িবহরে পুনরায় হামলা হয়। এতে দলটির মূখ্যসংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমের গাড়ির পেছনের কাচ ভেঙে যায়। এই হামলার জন্যও এনসিপি ছাত্রদলকে দায়ি করেছে। এ নিয়ে এক ধরনের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উভয় পক্ষ একে অপরকে দোষারোপ করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের সংঘাত ও হামলার ঘটনা কেন ঘটবে? জুলাই অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর জুলাইকে কেন্দ্র করে ফ্যাসিবাদমুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করবে, এটাই স্বাভাবিক। এতে ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্য জোরদার হবে। দেশে যাতে ফ্যাসিবাদ আর কখনো ফিরতে না পারে, এ লক্ষ্যে সকল রাজনৈতিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কর্মসূচি পালন করবে, তা গণতন্ত্রমনস্ক সকলেরই কাম্য। কর্মসূচী পালন করতে গিয়ে কেন বাধা দেয়া হবে এবং কেন বাধা দেয়ার কারণ তৈরি হবে? জুলাই গণঅভ্যুত্থান এমন একটি অভ্যুত্থান, যাতে দলমত নির্বিশেষে সকলেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে অংশগ্রহণ করেছিল। বিএনপি, জামায়াতসহ সব রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল। এখানে কোনো দলেরই একক কৃতিত্ব নেয়ার কিছু নেই। বিভিন্ন দলের এবং সাধারণ জেন-জিরা হাসিনার মতো নিকৃষ্ট ফ্যাসিস্টকে উৎখাতে যেভাবে সংগ্রাম করে জীবন দিয়েছে, পঙ্গু হয়েছে, তা ইতিহাসে বিরল। তারা এক অসম্ভব ও ঐতিহাসিক ঘটনার জন্ম দিয়েছে। নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটিয়েছে। তাদের এই অসীম ত্যাগের দর্শন ফ্যাসিবাদমুক্ত পরিবেশে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের লালন করা কর্তব্য। পরিতাপের বিষয়, আমরা দেখছি, তারা সেই পুরোনো পারস্পরিক দোষারোপ এবং সংঘাতের রাজনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। এনসিপির সাথে ছাত্রদলের যে সংঘাত ও সংঘর্ষ হয়েছে, তা দেখে গণতন্ত্রমনস্ক মানুষ ব্যথিত হয়েছে। তাদের মতে, ভাই ভাইয়ের সাথে কেন সংঘাতে জড়াবে? কেন নিজেদের মধ্যে সংঘাতের সূত্রপাত হবে? অথচ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাদের একজোট হয়ে থাকার কথা। মতভিন্নতা থাকলেও পারস্পরিক সুসম্পর্ক নিয়ে চলার কথা। হবিগঞ্জ ও সিলেটের সংঘাতের ঘটনায় তাতে যেন ছেদ পড়েছে। আমরা মনে করি, ক্ষমতাসীন বিএনপির হাইকমান্ডের উচিৎ, বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা। যারা সংঘাতে জড়িয়েছে, তাদেরকে অধিক সতর্ক ও সংযমী হয়ে চলা এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেয়া। এনসিপিরও উচিৎ, নেপথ্যে থাকা কোনো দলের উসকানির ফাঁদে পড়ে অযাচিতভাবে এমন বক্তব্য-বিবৃতি না দেয়া, যাতে সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দলটির উচিৎ, সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিপক্কতার পরিচয় দেয়া। তাকে মনে রাখতে হবে, তাদের সভা-সমাবেশের নিরাপত্তা সরকারই দেবে, অন্যকোনো দল দিতে পারবে না। কাজেই, সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে এমন আক্রমণাত্মক, উসকানিমূলক ও হুমকিমূলক বক্তব্য-বিবৃতি দেয়া উচিৎ নয়, যাতে সরকার সমর্থকরা উত্তেজিত হয় এবং সরকারের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়। তাদের এটাও স্মরণে রাখতে হবে, রাজনৈতিক দল হিসেবে সরকার তাদের নেতাদের সবসময় পাহারা দিয়ে রাখতে পারবে না। জনগণের কাছে নিজেদের এমনভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে, যাতে জনগণই তাদের পাহারাদার হয়। বিরোধীদল বলে সরকারকে শত্রুজ্ঞান করার মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সরকার খারাপ কাজ করলে অবশ্যই তা গণতান্ত্রিক উপায়ে বিরোধিতা করতে হবে এবং কী করতে হবে, তার পরামর্শ দিতে হবে। শুধু বিরোধিতার খাতিরে বিরেধিতা করার রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি থেকে তাদের বের হয়ে আসতে হবে। যৌক্তিক এবং জনগ্রহণযোগ্য বিরোধিতা করতে হবে। তাদের উপলব্ধি করতে হবে, ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের এক লক্ষ্যে সরকারিদলসহ সকলেই একজোট হয়ে আন্দোলন করেছে এবং তার পতন ঘটিয়েছে। এই ফ্যাসিস্ট এবং ফ্যাসিবাদ যাতে আর কখনোই দেশের মাটিতে জায়গা না পায়, সেই লক্ষ্যে ঐক্য অটুট রাখতে হবে। কারণ, ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দোসরদের ষড়যন্ত্র থেমে যায়নি। তারা একের পর এক দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে, ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ ষড়যন্ত্র। তারা দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে কাজ করছে। এমন প্রেক্ষাপটে, কোনো রাজনৈতিক দলেরই উচৎ হবে না, পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তোলা। এতে ওই ষড়যন্ত্রকারী চক্র ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করবে, যা আখেরে দেশের জন্য ভয়াবহ ক্ষতি বয়ে আনবে। দেশকে দেশি-বিদেশি ও ফ্যাসিস্টদের ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত রাখতে সরকার ও বিরোধীদল প্রত্যেককে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
