সম্পাদকীয়

জনশক্তি ও গার্মেন্ট রফতানি বাড়াতে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে

বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত জনশক্তি রফতানিতে মন্দাবস্থা দেখা দিয়েছে। গত বছরের আট মাসের তুলনায় এ বছরের আট মাসে এ খাতে রফতানি প্রায় ৩২ শতাংশ কমেছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, গত বছর (২০২৫) জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৭ লাখ ৩৯ হাজার ৮৭০ জন বিভিন্ন দেশে গিয়েছে। এ বছরের (২০২৬) জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গিয়েছে ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৬৮০ জন। এ চিত্র থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, জনশক্তি রফতানি খাতটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। গতকাল ইংরেজি দৈনিক নিউ এজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জনশক্তি রফতানির প্রধানতম ডেস্টিনেশন মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশেও কমেছে। ২০১৮ সাল থেকে ওমান, বাহরাইন, মালয়েশিয়া, মৌরিতানিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে জনশক্তি রফতানি বন্ধ কিংবা কমে গেছে। এর মধ্যে গত ছয় মাস ধরে চলা ইরানযুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জনশক্তি রফতানি শঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। সেসব দেশ থেকে অনেকে দেশে ফিরে আসছে। ইউক্রেনযুদ্ধের সময় থেকে চলা এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ইরানযুদ্ধ। এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাতে পড়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জনশক্তি রফতানির বাজার সম্প্রসারিত করার নতুন নতুন ডেস্টিনেশন খোঁজার কাজ শুরু করেছে সরকার। জনশক্তি রফতানি কমে যাওয়ার কারণ ইরানযুদ্ধ ও ইউক্রেনযুদ্ধ হলেও কিছু বেসরকারি রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি যথাযথ কাগজপত্র ছাড়া অবৈধভাবে লোক পাঠানোর কারণে দেশগুলোতে বাংলাদেশের ভাবমযার্দা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এর প্রভাব জনশক্তি রফতানিতে পড়ছে। জনশক্তি রফতানি কমে যাওয়ার এই প্রবণতায় রেমিট্যান্স যেমন কম আসছে, তেমনি বেকারত্বের হার বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, দ্রুতই ইরানযুদ্ধের অবসান হবে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। যুদ্ধে সউদী আরব, কাতার, ওমানসহ অন্যদেশগুলোর স্থাপনা ও ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধ শেষ হলে এসব দেশে বিপুল কর্মযজ্ঞ শুরু হবে। তাতে অনেক শ্রমিক ও লোকবলের প্রয়োজন হবে। এটি বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে নতুন করে চাঙা করতে সহায়তা করবে। এজন্য দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুারোসহ সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয়কে জনশক্তি রফতানির সব ধরনের প্রস্তুতি এখনই নিতে হবে, যাতে যুদ্ধোত্তর পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার দ্রুত ধরা যায়। শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, নতুন নতুন শ্রমবাজারের সন্ধান করতে হবে। ইউরোপের দেশগুলো এখন শ্রমশক্তি রফতানির বড় বাজারে পরিণত হয়েছে। দেশগুলোতে বয়স্ক লোকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সেখানে শ্রমজীবীর সংখ্যা কমে গেছে। কাজ করার মতো লোকের অভাব দেখা দিয়েছে। সেসব দেশে জনশক্তি রফতানির বড় সুযোগ রয়েছে। জাপান ও চীন বড় শ্রমবাজার হতে পারে। দেশ দুটিতে জন্মহার প্রায় শূন্যতে নেমে আসায় কাজ করার মতো লোকবল কমছে। তবে সবার আগে প্রয়োজন বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারের উপর সমীক্ষা চালানো। দেশগুলোতে কোন কোন খাতে কী ধরনের লোকবল প্রয়োজন, তা নির্দিষ্ট করে সে অনুযায়ী লোকজনকে প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিখিয়ে পাঠালে সহজে দেশগুলোর শ্রমবাজার ধরা যাবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী জনসভা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে এ কথা বলে আসছেন। এ কাজটি করতে পারলে বিদেশে কর্মসংস্থান যেমন সহজ হবে, তেমনি খাতটি শক্তিশালী হয়ে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করবে। এক্ষেত্রে সেসব দেশে নিয়োজিত আমাদের রাষ্ট্রদূতদের সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখা জরুরি। দেখা যাচ্ছে, এ নিয়ে তাদের তেমন কোনো ভূমিকা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। দেশগুলোতে তারা কী কাজ করেন, তার তেমন কোনো ফিরিস্তি দেশের জনগণ জানে না। তারা যেন অনেকটা ফরমায়েসি কাজ করছেন। অথচ আমাদের দেশে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত তাদের দেশের স্বার্থরক্ষাসহ ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য যেভাবে সারাদেশ চষে বেড়ান, এ তুলনায় বিদেশে আমাদের রাষ্ট্রদূতরা কিছুই করছেন না। অথচ সংশ্লিষ্ট দেশে জনশক্তি রফতানির বাজার তৈরি করতে, ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে তাদের যথেষ্ট করণীয় রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি এ ধরনের নির্দেশনা থাকা জরুরি। বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের প্রধান দুটি খাত জনশক্তি ও গার্মেন্টকে আরো সম্প্রসারিত এবং শক্তিশালী করতে সরকারের সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া অপরিহার্য।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট