রোগি বেড়েছে ওই ওয়ার্ডের চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে রামেক হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে চার মাস ধরে রোগি ভর্তি বন্ধ
হাবিব আহমেদ
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে গত চার মাস ধরে রোগী ভর্তি বন্ধ রয়েছে। এতে চোখের চিকিৎসা নিতে এসে ভর্তি হতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন রোগিরা। জরুরীভাবেও মিলছে না রোগিদের চোখের চিকিৎসা। বর্হিবিভাগে যে চিকিৎসা হচ্ছে তা নাম মাত্র। হাসপাতাল ও বর্হিবিভাগে চোখের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা রোগিরা চিকিৎসা না পেয়ে ছুটছেন বাইরের ক্লিনিকগুলোতে। অধিক টাকা ব্যয় করে নিতে হচ্ছে চিকিৎসা। তবে রামেক হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে রোগি ভর্তি বন্ধ থাকায় ওই ওয়ার্ডের চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগি বেড়েছে। বেড়েছে আয়ও। চক্ষু ওয়ার্ডের চিকিৎসকরা বলছেন, ভর্তি বন্ধ থাকলেও কিছু কিছু ওপারেশন হচ্ছে। কি কারণে ভর্তি বন্ধ রাখা হয়েছে তার সঠিক ব্যাখ্যার চিকিৎরসকরা দিতে পারেননি। হাসপাতালটির পরিচালকের উপর দায় চাপিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করছেন। রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে চক্ষু বিভাগে কাজ চলছে, তাই ভর্তি বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে জরুরীভাবে অপারেশন ও চিকিৎসা চলমান রয়েছে।
সরজমিন রামেক হাসপাতালের চুক্ষ বিভাগ ঘুরে দেখা গেছে, গত সোমবার কোনো রোগি চক্ষু বিভাগে ভর্তি হয়নি। যা রয়েছে তার সবগুলোই পুরাতন রোগি। পুরাতন রোগি চোখ অপারেশন করে বাসায় চলে গেছেন। কেউ এসে বাইরে অপেক্ষা করছেন ডাক্তার দেখানোর জন্য। চক্ষু ওয়ার্ডে নারী ও পুরুষ পৃথক দুটি ওয়ার্ড রয়েছে। এরমধ্যে পুরুষ ওয়ার্ডে রোগি ভর্তি আছে (পুরোনো) ১০ জন আর নারী ওয়ার্ডে রয়েছে পাঁচজন। যারা ভর্তি আছেন তারা মুলত অপারেশনের জন্য অপেক্ষমান রোগি। অপারেশন থিয়েটারে সংস্কার কাজ করায় তারা দীর্ঘ দিন যাবৎ ভর্তি রয়েছেন কিন্তু অপারেশন হচ্ছে না। হাসপাতালের অন্যান্য ওয়ার্ডে যেখানে বেড বা ফ্লোরে রোগির চাপে পা রাখা মুশকিল, সেখানে চক্ষু বিভাগের ওয়ার্ডে রোগি নেই। পুরো ওয়ার্ড ফাঁকা পড়ে আছে। বর্হিবিভাগে চিকিৎসা নিতে আশা অনেক রোগিকে ভর্তির জন্য টিকিটে লিখে দেয়া হয়। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় বর্হিবিভাগ থেকেও আর ভর্তির জন্য কোনো রোগি হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে পাঠানো হয় না। কেউ ভর্তি হতে চাইলে তাকে বর্হিবিভাগেই জানিয়ে দেয়া হচ্ছে ভর্তি বন্ধ। আবার রোগিকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে ওই ওয়ার্ডের চিকিৎসকরা যেখানে ব্যক্তিগত চেম্বারে বসেন সেখানে যাওয়ার জন্য।
জানা গেছে, চক্ষু বিভাগের নির্ধারিত ওয়ার্ডটির দুটি অংশ ডেঙ্গু ও হামের রোগিদের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হচ্ছে। আর মাত্র দুটি রুম চক্ষু ওয়ার্ড হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এই ওয়ার্ডে যে অপারেশন থিয়েটার ছিল তা বন্ধ করে সংস্কার করা হচ্ছে। গত দুমাস যাবৎ চলছে সংস্কার কাজ। একটি অপারেশন থিয়েটারে রোগিদের চোখের অপারেশন চলছে নাম মাত্র। এই ওয়ার্ডে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকরা কাজ কম না থাকায় ব্যক্তিগত চেম্বারে সময় দিচ্ছেন বেশি। এসব চিকিৎসকদের চেম্বারে রোগির ভীড়ও বেশি। আর নার্সরা তাদের নির্ধারিত হাসপাতালের রুমে গল্প, মোবাইল দেখে সময় পার করছেন। আর যে ১৫ জন রোগি আছেন তারা নিজেদের মত বেডে শুয়ে অপারেশনের জন্য দিন পার করছেন। অনেকেই আবার এই হাসপাতাল থেকে বাইরে গিয়ে অপারেশন ও অন্যান্য চিকিৎসা নিচ্ছেন।
জানা গেছে, বর্তমান রামেক হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে চিকিৎসকের সংখ্যা সহযোগি, সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধানসহ ১১ জন। প্রায় ১০ জন ইন্টার্ণ চিকিৎসক রয়েছেন। নার্স রয়েছে প্রায় ১২ জন। এই ওয়ার্ডে রোগিদের সেবা দেয়ার জন্য চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয় মিলে রয়েছেন প্রায় ৩৩ থেকে ৩৫ জন। কিন্তু রোগির সংখ্যা মাত্র ১৫ জন। দেখা গেছে, কিছু সংখ্যক রোগি দিনের পর দিন অপারেশনের জন্য বেডে শুয়ে আছেন। আর চিকিৎসক, নার্সরা অপারেশন থিয়েটার না থাকার ওযুহাতে ওয়ার্ডে বসে থাকছেন। তবে চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারে চোখের রোগির ভীড় বাড়ছে। এতে চিকিৎসকরা লাভবান হলেও রোগিরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চক্ষু রোগি বলেন, তিনি প্রায় ১৫ দিন আগে চোখ অপারেশনের জন্য ভর্তি হয়েছেন। অনেক কাঠখড়ি পোড়ানোর পর তিনি ভর্তি হতে পেরেছেন। ভর্তি হতে পারলেও অপারেশনের সিরিয়াল এখানো তিনি পাননি। বিষয়টি সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসককে জানানো হলে তারা জানিয়ে দেন অপারেশন থিয়েটার নেই। যেটা আছে সেটাতে এতো দ্রুত অপারেশন হবে না অপেক্ষা করতে হবে। এক নারী রোগি বলেন, অপারেশন তো হচ্ছেই না, তার উপর কেউ দেখাশোনা করতেও আসে না। তিনি জানান, চিকিৎসকদের দেয়া চোখের সকল পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছে ২০ দিন আগে। কিন্তু সিরিয়াল কবে আসবে সেটা তিনি জানেন না। এমন অভিযোগ করেন একাধিক রোগি।
রামেক হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডাক্তার আমিনুর রশীদ আকন্দ বলেন, চক্ষু বিভাগে রোগি ভর্তির বিষয়টি আমি পুরোটা জানি না। তবে সংস্কার কাজ চলছে এ কারণেও হতে পারে। তিনি বলেন, আমরা মিনি অপােরশন থিয়েটারে প্রতি সপ্তাহে ২০ থেকে ২৫ জন রোগিকে অপারেশন করি। রোগির সংখ্যাই নারী পুরুষ মিলে ১৫ জন সপ্তাহে ২০ থেকে ২৫ জন রোগির কিভাবে অপারেশন হয়, জানতে চাইলে তিনি বলেন, রোগি যে ভর্তি হয় না এমনটি না, সাধারণ কোনো রোগি ভর্তি নেয়া হয় না। কিন্তু জরুরী অপারেশনের প্রয়োজন এমন রোগি ভর্তি নেয়া হয়।
বিষয়টি নিয়ে রামেক হাসপাতালে মুখপাত্র ডাক্তার শেখ শামীম আহমেদ বলেন, ইচ্ছে করে চক্ষু বিভাগে ভর্তি বন্ধ রাখা হয়নি। সাময়িক অসুবিধার কারণেই রোগি ভর্তি বন্ধ করা হয়েছে। সংস্কার কাজ প্রায় শেষের পর্যায়ে এসেছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে চক্ষু বিভাগে রোগি ভর্তি কার্যক্রম শুরু হবে।
চক্ষু বিভাগের এমন পরিস্থিতি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চক্ষু রোগীদের ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ থাকা এবং বিকল্প ব্যবস্থা না করায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন রোগির অভিভাবকরা।
