জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে
তেল-গ্যাস নিয়ে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত নতুন নয়। হরিপুর, শালিবাহন, চিমুতং ইত্যাদি তেল-গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে অতীতে যা হয়েছে, তা নিছক চক্রান্ত ছাড়া কিছুই নয়। চক্রান্ত বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে হয়েছে। এখনো হচ্ছে। সম্প্রতি গ্যাসের যে সংকট দেখা দিয়েছে, অনেকের মতে, তার পেছনেও দেশি-বিদেশি হাত থাকতে পারে। ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ড, পরে এই অজুহাতে অচল টার্মিনাল সচলে দীর্ঘসূত্রতা, এবং সর্বশেষ এলএনজিবাহী কার্গোকে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানানো ইত্যাদি পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যমূলক বলেই মনে হওয়া সম্ভব। উল্লেখ করা যেতে পারে, কক্সবাজারের মহেশখালিতে যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে, তার একটি হলো মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল এবং অপরটি হলো, দেশীয় কোম্পানি সামিট গ্রুপের সামিট এলএনজি টার্মিনাল। দুটি টার্মিনাল আবার পরিচালনা করে এক্সিলারেট। দুটি কোম্পানির কেউ-ই এলএনজি আমদানি করে না। আমদানি করে সরকারি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা। পেট্রোবাংলা চুক্তিভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ করে। এক্সিলারেট এনার্জির কাজ ভাসমান দুই এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে এই গ্যাস রূপান্তর করে পাইপ লাইনে সরবরাহ করা। দেশে গ্যাসের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। বর্তমানে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়েও এই চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। সাধারণত জাতীয় গ্রীডে দৈনিক ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে আসে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট। এমনিতেই গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে, এরপর যদি এলএনজি টার্মিনালের দুটির একটি বন্ধ হয়ে থাকে তবে পরিস্থিতি কী হতে পারে, সহজেই অনুমেয়। বন্ধ থাকা এলএনজি টার্মিনালটি ১৭ দিন পর চালু করা হয়। এই ১৭ দিন গ্যাস নিয়ে রীতিমত হাহাকার সৃষ্টি হয়। চুলা অনেক স্থানেই জ্বলে না। শিল্পে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। উৎপাদন ব্যাহত হয়। অনেক কারখানা গ্যাসের অভাবে অচল হয়ে যায়। শ্রমিক-কর্মীরা কর্মহীন হয়ে পড়ে। এলএনজি টার্মিনাল চালু হওয়ার পরও আবহাওয়ার অজুহাতে সরবরাহ ব্যাহত হয়। তবে সুখবর হলো, ৬৬ হাজার টনের যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা এলএনজিবাহী একটি জাহাজ এখন সামিট টার্মিনালে সংযুক্ত হয়েছে। এতে সরবরাহ বাড়ায় গ্যাস পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য বিনিয়োগের বিকল্প নেই। বিনিয়োগ শিল্পায়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ ঘটায়। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে। কাজেই, বিনিয়োগ বাড়াতেই হবে। আর বিনিয়োগ আকর্ষণ ও বাড়াতে হলে বিনিয়োগের পূর্বশর্ত জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংস্থান এবং বিনিয়োগের কাম্য পরিবেশ ও আইনশৃংখলা সুনিশ্চিত করতে হবে। এজন্য সর্বাগ্রে তেল ও গ্যাসের দেশীয় উৎসের প্রতি, তার অনুসন্ধান ও আহরণের প্রতি নজর দিতে হবে। বাপেক্সকে সুসজ্জিত ও সর্বোচ্চ কর্মক্ষম করে তুলতে হবে, যাতে স্থলে ও সাগরে তার পক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান সম্ভবপর হয়। কাগজে-কলমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আমরা দেখতে চাই না। বাস্তবে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কয়লাভিত্তিক যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশে রয়েছে, সেগুলো আমদানিকৃত কয়লার ওপর নির্ভরশীল অথচ দেশের মাটির অভ্যন্তরে বিপুল পরিমাণ কয়লার মজুদ রয়েছে। কয়লাখনিগুলোর অধিকাংশই ফেলে রাখা হয়েছে। এগুলো সচল করতে হবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে। তবে ভারতের নিম্নমানের যন্ত্রপাতি দিয়ে তৈরি রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নজির এক্ষেত্রে আমরা দেখতে চাইলে, রূপপুর আণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে যতদ্রুত সম্ভব উৎপাদনে আনতে হবে। এই সঙ্গে বায়ু ও সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকে প্রাধান্য দিতে হবে। এভাবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি দ্রুতায়িত হবে। সরকারকে এ ব্যাপারে যথাযোগ্য উদ্যোগ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হলে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন ও শিল্পপার্ক ইত্যাদি যতই করা হোক, কোনো লাভ হবে না।
