সম্পাদকীয়

আদানির বিদ্যুৎ বন্ধ কি পরিকল্পিত?

দেশজুুুুুড়ে যখন বিদ্যুতের জন্য হাহাকার চলছে, প্রতিদিন তিন হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি লোডশেডিং করতে হচ্ছে, তখন আদানি পাওয়ার বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের ১ হাজার ৬ শ’ত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেন্দ্রটির উৎপাদন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে। জানা গেছে, ১১ সেপ্টেম্বর হঠাৎ ওই ইউনিটের বয়লার সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দেয় ও উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে ২ সেপ্টেম্বর আদানি পাওয়ারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভারতের রেলপথে জট ও কয়লা পরিবহনে বিধিনিষেধের কারণে গোড্ডা কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহ কমে গেছে। আগেই আশংকা করা হয়েছিল, কয়লা সরবরাহ কমে যাওয়ার অজুহাতে গোড্ডা থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ যে কোনো সময় কমে যেতে পারে। সেই আশংকাই সত্য হলো; তবে কয়লা সরবরাহ কমার কারণে নয়, ‘বয়লার কাণ্ডে’র কারণে। পর্যবেক্ষকদের সঙ্গত প্রশ্ন : সত্যি সত্যিই বয়লার সংক্রান্ত সমস্যার কারণে ইউনিট উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে, নাকি উদ্দেশ্যমূলকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে? তাদের ধারণা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর না করে দেয়ার পরদিনই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথিত ইউনিটের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। তাদের মতে, এ পদক্ষেপ ভারতের কূটনৈতিক অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে, আদানির ওই গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধুমাত্র বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের (বিক্রীর) জন্যই তৈরি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে ২০১৭ সালে ২৫ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ধরনের আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ চুক্তির ক্ষেত্রে সরবরাহ ব্যাহত হলে দ্রুত অপরিহার্য বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া সরবরাহকারীর দায়িত্ব। কিন্তু এ পর্যন্ত আদানি কিংবা ভারত সরকারের তরফে এমন পদক্ষেপ নেয়ার খবর পাওয়া যায়নি।   সর্বশেষে সরকারি পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আদানির বিদ্যুতের মূল্য নিকটতম বেসরকারি প্রতিযোগীর তুলনায় ৩৯.৭ শতাংশ বেশি এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ যে মূল্য পরিশোধ করছে তা যৌক্তিক বাজার দরের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। একারণে বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ৪শ’ থেকে ৫শ’ মিলিয়ন ডলার বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন মতে, সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ ইউনিট ভিত্তিক হিসাব অনুসারে ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে বাংলাদেশ আদানির কাছ থেকে প্রায় ৮.১৬ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ কেনে, ওই অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল ১৪.৮৭ টাকা, যার ফলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ১শ’ কোটি টাকা। একই সময়ে ভারতের অন্যান্য বিদ্যুৎ সরবরাহকারীর কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের গড় মূল্য ছিল ৯.৫৭ টাকা। অর্থাৎ আদানির বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সরবরাহকারীর বিদ্যুতের দামের মধ্যে ব্যবধান ছিল ৫.৩০ টাকা বা প্রায় ৫৫ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থ বছর আদানির কাছ থেকে নেয়া বিদ্যুৎ যদি ভারতের অন্যান্য সরবরাহকারীর বর্ণিত দামে কেনা যেতো তাহলে মোট ব্যয় দাঁড়াতো ৭ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক অর্থবছরেই অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে ৪ হাজার ৩শ’ কোটি টাকা।   আশা করি, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একটি অনুপুংখ তদন্তের ব্যবস্থা নেবে। বিদ্যুতের স্থাপিত ক্ষমতা ও বর্তমান উৎপাদনের মধ্যে বিরাট ব্যবধান রয়েছে। স্থাপিত ক্ষমতার অর্ধেকও আমরা উৎপাদন করতে পারছি না। আবার চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যেও রয়েছে অন্তত তিন-সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের ব্যবধান। কীভাবে উৎপাদন বাড়ানো যায়, অন্ততঃ প্রতিদিনের চাহিদা পূরণ করা যায়, সেটা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ। সরকার এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকায় আছে। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন, কিছুদিনের মধ্যেই গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট আর থাকবে না। সংকট বাড়ানোর জন্য কোনো মহল বা তরফ থেকে অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে কিনা, সে ব্যাপারে অবশ্যই সরকারকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট