চঁপাইয়ে তিন বছরেও শেষ হয়নি পাগলা নদীর সেতু কাজ, দুর্ভোগে সোয়া দুই লাখ মানুষ
জাহিদ হাসান মাহমুদ মিম্পা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ:
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে পাগলা নদীর ওপর বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মইন উদ্দিন আহমদ মন্টু সেতুর নির্মাণকাজ তিন বছরেও শেষ হয়নি। চলতি বছরের নভেম্বরে সেতুটি কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও ব্রিজের অ্যাপ্রোস রোড এবং সেতুর ৪০ ভাগ কাজ এখনো বাকি।
৩৫টি বাড়ির ভূমি অধিগ্রহণ ও বর্ষার অজুহাতে এক বছর ধরে বন্ধ ৩০ কোটি টাকার সেতু নির্মাণের কাজ। কাজ শুরুর দেড় বছরে অন্তত এ নিয়ে চারবার বন্ধ হয়েছে সেতুটির নির্মাণকাজ। এতে উপজেলার তিন ইউনিয়নের মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
জানা গেছে- জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার সর্ব উত্তর পশ্চিমের তিন ইউনিয়ন মনাকষা, বিনোদপুর ও দুলর্ভপুর। এই তিন ইউনিয়নে চলাচলের একমাত্র রাস্তা শিবগঞ্জ বাজার থেকে পাগলা নদীর এই ব্রিজ। গুরুত্ব বিবেচনায় পাগলা নদীর ওপর নয়জনের দুই একর ৩৯ শতক জমি ১৯৯১-৯২ সালে অধিগ্রহণ করে নির্মাণ করা হয় বেইলি ব্রিজটি।
তৎকালীন সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মইন উদ্দিন আহমদ মন্টু ডাক্তার সেটি নির্মাণ করেন। নির্মাণের দীর্ঘদিন পরে সেতুটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়লে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তারই ছেলে সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহম্মেদ বেইলি ব্রিজের পাশে সেতুর নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। পল্লী সড়কের গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়ে) প্রকল্পের আওতায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মইন উদ্দিন আহমদ মন্টু নাম দিয়ে ২০২৩ সালের ১৪ অক্টোবর সেতুটির উদ্বোধন করেন সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল। ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০২৬ সালের ১৪ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা। ১৭২.৩০০ মিটার সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯ কোটি ৯৮ লাখ ৭৭ হাজার ৩১৫ টাকা।
এদিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নির্মাণধীন সেতুর পাশের বেইলি ব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কর্তৃপক্ষ ব্রিজের প্রবেশমুখে ইটের পিলার বানিয়ে তিন বছর ধরে ভারী যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এতে করে দুর্লভপুর ও মনাকষার ব্যবসায়ীরা পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য ২০/৩০ কিলোমিটার ঘুরে কানসাট ব্রিজ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে বাড়ছে পরিবহন খরচ। সেই সঙ্গে সেতুটি জরাজীর্ণ, সরু ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সারাদিন যানজট লেগেই থাকছে। সেতুর স্টিলের পাটাতন কয়েক দফা ভেঙে পড়ে যাওয়ার পর মেরামত করে সেতুটি সচল রাখা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠানে আসা ও যাওয়ার সময় দুর্ভোগে পড়েন। সেতুটি পার হতে অপেক্ষা করতে হয়, ঘণ্টার পর ঘন্টা। বিশেষ করে পরীক্ষার সময় এ দুর্ভোগ আরও বাড়ে। নভেম্বরে ব্রিজের কাজ শেষ হবার কথা থাকলেও ভূমি অধিগ্রহণ এবং বর্ষা মৌসুমের দোহায় দিয়ে এক বছর ধরে এর কাজ বন্ধ থাকায় বিপাকে তিন ইউনিয়নের জনসাধারন। দীর্ঘদিনেও এর কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে। বেড়েছে দুর্ভোগ। অনেকের দাবি দায়ীদের আইনের আওতায় আনার।
স্থানীয়রা জানায়, ৩৫টি বাড়ি ও কয়েকটি দোকানে নোটিশ দেওয়া হলেও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে এর নির্মাণকাজ। বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী পড়ে আছে খোলা আকাশের নিচে। ২০২৪ সালের পাঁচ মার্চ জেলা এলজিইডি অফিসের ০১-২০৯১-২০৯২ স্মারকে সাতজনের নামে অধিগ্রহণ করা জমি থেকে সাত দিনের মধ্যে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সেখান থেকে তারা সরে যাননি। উল্টো জেলা প্রশাসকের কাছে সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করেন। সেতুর দুই পাশে ৩৫টি বাড়ি উচ্ছেদের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে দুইবার আবেদন করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। আর নোটিশপ্রাপ্তদের দাবি তাদের একমাত্র বাসস্থান থেকে উচ্ছেদের আগে নায্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুরুর দিকেই নির্মাণে অনিয়ম হওয়ায় এলাকাবাসী বাধা দিয়েছিলেন। পরে তদন্ত করে অনিয়ম দূর করা হয়েছে। ৪৫ ভাগ কাজ শেষের পর দ্বিতীয় দফায় নির্মাণ অতিবৃষ্টি এবং বন্যার কারণে বন্ধ ছিল। বন্যা পরবর্তী কাজ শুরুর পর ৬০ ভাগ কাজ শেষে বর্তমানে বন্ধ আছে জমি অধিগ্রহণ ও বন্যা জটিলতায়।
এদিকে কয়েকটি সূত্র বলছে, নির্মাণাধীন সেতুর পাশেই একটি বেইলি সেতু রয়েছে। সেটি নির্মাণের সময় ৯ জনের দুই একর ৩৯ শতক জমি ১৯৯১-৯২ সালে অধিগ্রহণ করা হয়। কিন্তু দুইজনকে অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও বাকি সাতজন কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। তবে সবাই অধিগ্রহণ করা জমিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। তাদের দাবি এবার টাকা বুঝে পাওয়ার পরই তারা স্থান ত্যাগ করবেন।
দুর্লভপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম আজম জানান, প্রশাসন বলছে সঠিক কাগজপত্র না থাকায় ভুক্তোভোগীরা কোনো ক্ষতিপূরণ পাবে না। আবার ভুক্তোভোগীদের দাবি তাদের সঠিক কাগজপত্র আছে। ভূমি মালিক দাবিকারী ও প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রিতার জন্য এ জনদুর্ভোগ। উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় দুর্লভপুর, মনাকষা ও বিনোদপুর এ তিন ইউনিয়নের এক লাখ ১৫ হাজার ভোটারসহ সোয়া দুই লাখ জনগোষ্ঠীর ব্যস্ততম এ সেতুটি নির্মাণে ধীরগতির কারণে জনগণের ভোগান্তি চরমে।
সেতু নির্মাণের ঠিকাদার আব্দুল মান্নান সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাদের কোনো গাফিলতি নাই। উচ্ছেদের বিষয়টি সুরাহা দ্রুত হলে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই পুরো কাজ শেষ হবে। দুর্লভপুরের মুদি দোকান মালিক শাহিন আলী জানান, শিবগঞ্জ বাজার থেকে তার দোকানের দূরত্ব মাত্র তিন কিলোমিটার হলেও ট্রাকে করে পণ্য আনার জন্য ৩০ কিলোমিটার ঘুরতে হয়। এতে তার পরিবহন খরচ বাড়ছে।
মনাকষার বাকরুলী বিশ্বনাথপুর গ্রামের হারুন অর রশিদ জানান, তিনি জরুরি কাজে জেলা শহরে যাওয়ার জন্য পাগলা নদীর বেইলি ব্রিজে জ্যামের কারণে আধা ঘণ্টা আটকে থাকার পর দুই কিলোমিটার হেঁটেই শিবগঞ্জ শহর চলে আসেন। ততক্ষণে যার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ছিল তিনি চলে গেছেন। তিনি বলেন, এই দুর্ভোগ শুধু তার একার নয়, তিন ইউনিয়নবাসীর নিত্যদিনের।
শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী সাহিনুল ইসলাম বলেন, বর্ষার কারণে সেতুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাঝের পিলারের কাজ বন্ধ আছে। তবে এসময়ে সেতুর দু’পাশের অ্যাপ্রোস সড়কের কাজটি হয়ত করা যেত। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের কাজ এখনও শেষ না হওয়ায় তা সম্ভব হচ্ছে না। সেতুর দুই দিকের জমি অধিগ্রহণ ও বাড়ি উচ্ছেদের ব্যাপারটি প্রক্রিয়াধীন। আশা করি শিগগিরই উচ্ছেদ হবে এবং যথাসময়ে সেতুর কাজ শেষ হবে।
