গোদাগাড়ীতে রাজশাহী ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট দৃশ্যমান হচ্ছে

স্টাফ রিপোর্টার

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে ওয়াসার ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। ওয়াসার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন কাজ শুরু করে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ খুবই ভালো। ভালো মানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করায় মানুষ প্রকল্পের বিষয়টি ভালোভাবে নিচ্ছেন। জনসাধারণ গোদাগাড়ীর পদ্মার ভূ-উপরিস্থ পানি শোধন করে সরবরাহ করা হবে রাজশাহী শহরে। রাজশাহীতে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে বাংলাদেশ-চীনের যৌথ উদ্যোগে নির্মাণাধীন ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট প্রকল্প। চার বছরের মেয়াদের এই প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার তিন বছরের মাথায় শেষ হয়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ। অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে। রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের পাশ দিয়ে পাইপ বসানোর কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলেছে। একই সঙ্গে নগরজুড়ে পানি সরবরাহের পাইপলাইন বসানোর কাজও এগিয়ে চলছে দ্রুতগতিতে। ক্রমবর্ধমান নগর রাজশাহীর জনসংখ্যা ও নগরায়ণের সঙ্গে বাড়ছে সুপেয় পানির চাহিদাও। বর্তমানে নগরীতে প্রতিদিন প্রায় তিন কোটি ৭০ লাখ লিটার পানির ঘাটতি রয়েছে। এই সংকট নিরসনে ২০১৮ সালের অক্টোবরে একনেক সভায় অনুমোদন পায় রাজশাহীতে ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনাগার প্রকল্প। পরে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হয় গোদাগাড়ী উপজেলার জোত-গোসাইদাস এলাকায়। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এই পানি শোধনাগার প্রকল্পটি নির্মিত হচ্ছে তিনটি ধাপে। পদ্মা ও মহানন্দা নদীর মোহনায় নির্মাণ করা হচ্ছে ইনটেক পয়েন্ট। এর কাছেই গড়ে উঠছে দৈনিক ২০ কোটি লিটার পানি শোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন মূল ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। আর নগরীর পাশে পবা উপজেলার হরিপুর এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে বুস্টার প্ল্যান্ট। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবগুলো অংশের কাজই এগিয়ে চলছে পরিকল্পনা অনুযায়ী।

রাজশাহী ওয়াসার সহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুর রহিম জানান, সর্বমোট মিলে ১৮০০ প্লাস শ্রমিক প্রতিদিন কাজ করছে। কাজের গতি খুবই ভালো, দৃশ্যমান। আমাদের কাজের ফিজিক্যাল পার্সেন্টেজ অলমোস্ট ৬৫ শতাংশ হয়ে গেছে। আমরা আশা করছি খুব দ্রুত কাজ শেষ হয়ে যাবে। রাজশাহী ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মো. পারভেজ মামুদ জানান, আগামী ২০৩৫ এর জন্য মহানগরে যে পানির চাহিদা থাকবে সেটাকে বিবেচনায় রেখে আমরা প্ল্যান্টের ক্যাপাসিটি নির্ধারণ করেছি। ২৬.৫ কিলোমিটারের মধ্যে অলরেডি আমরা ২১ কিলোমিটার পাইপ বসিয়ে ফেলেছি। চার বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, পদ্মা নদীর ইনটেক পয়েন্ট এলাকায় বছরজুড়েই অন্তত ৩০ ফুট গভীরতায় পানি পাওয়া যাবে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে প্রতিদিন ২০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। আর আধুনিক চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার পানির গুণগত মান ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

রুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল ওয়াকিল বলেন, আমাদের বারিন্দ ট্র্যাকে পানির সমস্যা আছে। আমাদের দিন দিন গ্রাউন্ড ওয়াটারের লেভেল দিন দিন নেমে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা পুরোপুরি গ্রাউন্ড ওয়াটারের ওপরে ডিপেন্ডেন্ট, আমাদের খাবার  পানিতে শুরু করে গৃহস্থালির সবকিছুতেই। এই কারণে এটা যদি অনেক আগে করতে পারতো আমাদের জন্য ভালো হতো এবং অবশ্য বর্তমানে যে কাজটা করছে পদ্মার পানি ট্রিটমেন্ট করে তারা শহরে নিয়ে আসবেন। এটা একটা বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে তাদের। বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ এই প্রকল্পের অগ্রগতিতে আশাবাদী রাজশাহীর নাগরিক সমাজও। তাদের প্রত্যাশা, সরকারের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাজশাহী অঞ্চলের অবকাঠামো, সেবা খাত ও বাণিজ্যিক উন্নয়নে আরও বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে।

প্রকল্পে দেখা যায়, পদ্মায় পানির উচ্চতা ঠিকই আছে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পদ্মার পানিকে প্রধান উৎস ধরে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করছে ওয়াসা। ওয়াসা বলছে, সারা বছর এখানে অন্তত ৩০ ফুট গভীর পানি থাকবে। প্রতিদিন পানি সাপ্লাই দেবে ২০ কোটি লিটার। রাজশাহী ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ও চীনের হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড যৌথভাবে কাজ করছে। এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৬২ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ১ হাজার ৭৪৮ কোটি ও হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড ২ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা অর্থায়ন করবে। প্রকল্পটি জুলাই ২০১৮ শুরু করে জুলাই ২০২৪ সালে শেষ করার কথা থাকলেও এখন দিনরাত সমান তালে কাজ করছেন। চীনা এ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ৮০ ভাগ স্থানীয় লেবার, টেকনিশিয়ান ব্যবহার করছেন। প্রতিদিন কয়েক হাজার স্থানীয় শ্রমিক, ড্রাইভার কাজ করছেন। স্থানীয় বালু ব্যবসায়িগণ উপকৃত হচ্ছেন। তাদের নিকট থেকে বালু ক্রয় করে নিচ্ছেন। সঠিক সময়ে বিলও পরিশোধ করছেন। গোদাগাড়ী, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ব্যবসায়ী, শ্রমিকগণ উপকৃত হচ্ছেন। দু হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। অত্যন্ত ব্যয়বহুল রাজশাহী ওয়াসার এই প্রকল্প নিয়েই কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, এ ধরনের প্রকল্পে মূলে হলো উন্নতমানের পাইপ ও অন্যান্য সামগ্রীর ব্যবহার। কারণ এ ধরনের শোধনাগার কমপক্ষে ৭০ বছরের জন্য করা হয়ে থাকে। রাজশাহী ওয়াসার ট্রিটমেন্টে চীনা কোম্পানি উন্নত সামগ্রী ব্যবহার করায় এর জীবনকাল আরও দীর্ঘ হবে ইনশাআল্লাহ। ট্রিটমেন্টে উন্নত সামগ্রী ও ফ্রান্সের বিশ্বখ্যাত পানিশোধন প্রযুক্তি ও চীনের উন্নতমানের জিংজিয়ান কোম্পানির পাইপ স্থাপন করা হচ্ছে।

রাজশাহী ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে ৪ হাজার ৬২ কোটি টাকা। চীনের হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড কাজটি বাস্তবায়ন করছে। পদ্মায় সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনে চীনা এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২০২১ সালের ২১ মার্চ চুক্তি করে রাজশাহী ওয়াসা। এই ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমেই ২০৩৫ সালের মধ্যে রাজশাহী অঞ্চলে  পানি সরবরাহ শতভাগ নিশ্চিত করা হবে বলে আশা ওয়াসা কর্তৃপক্ষের। প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দেবে ১ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা। আড়াই থেকে তিন শতাংশ সুদে হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড ২ হাজার ৩১৩ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয় করবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময়সীমা চার বছর।

ওয়াসা জানায়, শহরে এখন প্রতিদিন পানির চাহিদা ১১ কোটি ৩২ লাখ লিটার। চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন পাম্পের সাহায্যে ভূগর্ভস্থ ৮ কোটি ৬৫ লাখ লিটার পানি তোলা হয়। আর এখন মাত্র ৯০ লাখ লিটার ভূ-উপরিস্থ পানি পরিশোধন করা হয়। তারপরও প্রতিদিন ১ কোটি ৭৭ লাখ লিটার পানির ঘাটতি থেকে যায়। নতুন প্ল্যান্ট হলে ঘাটতি থাকবে না। এজন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০১৫ সালে এ প্রকল্পের খসড়া সম্পন্ন করা হয়। এরপর ২০১৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদন হয়। পরে একই বছরের অক্টোবরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি পাস হয়। এরপর নানা সমীক্ষা চলছিল। সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার পরই চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি, আগামী মাসে এই প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হবে।

এদিকে, রাজশাহীর হরিপুর এলাকায় নির্মাণকাজ চলছে বুস্টার পাম্প প্রকল্পের। এই পাম্পের কাজও এগিয়ে চলেছে। এখানে মাটি খনন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন বুস্টারপাম্প নির্মাণের জন্য বিদ্যুৎ সাবস্টেশন নির্মাণের কাজ শেষের পথে।

রাজশাহী ওয়াসা প্রকল্পের চীনা প্রধান প্রকৌশলী সানচিং জানান, আমরা কাজ শুরু করেছি। এরই মধ্যে ভরাটের কাজ শেষ করেছি। আগামীতে এখানে পাইলিং ও অন্যান্য কাজ শুরু করা হবে। এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছিলেন, প্রকল্পটির মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহের পাশাপাশি আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতিতে সহায়ক হবে। বাংলাদেশ-চায়না একসঙ্গে কাজ করছে, ভবিষ্যতে দুদেশের সম্পর্কের আরো উন্নয়ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন চীনা রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফর করেছেন। এ ছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ব্যবসায়িক সম্মেলনে চীনের ৫০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। এভাবে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই। চীনের হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেডের সহায়তায় ইতিমধ্যে পানি শোধনের ওই প্রকল্পটির কাজ ৬৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, ২০২৭ সাল নাগাদ পুরো কাজ শেষে দৈনিক ২০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা যাবে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে নির্মাণাধীন এই শোধনাগার থেকে।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট