আগামী অর্থবছরে বিদ্যুতে লোকসান গুণতে হবে ৬৫,৫৫৫ কোটি টাকা
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি, বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করার কারণে দেশের বিদ্যুৎখাত এখন ভয়াবহ অবস্থার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। এরপর সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্কট- এ অবস্থাকে আরো শোচনীয় করে তুলেছে। ফলে আগামী অর্থবছরে (২০২৬-২০২৭) বিদ্যুৎখাতে সরকারকে লোকসান গুনতে হবে ৬৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের দেড় বছরের স্বাস্থ্য বাজেট এবং আড়াই বছরের কৃষি বাজেট দেয়া সম্ভব। অন্যভাবে বলা যায়, আগামী অর্থবছরের বিদ্যুৎখাতে যে পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি দিতে হবে তা চলতি অর্থবছরের স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দের চেয়ে ৫৫ ভাগ বেশি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বরাদ্দ রয়েছে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। একই সাথে চলতি অর্থবছরে কৃষিখাতে বরাদ্দ রয়েছে ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগের সম্প্রতি হালনাগাদ এক প্রতিবেদনে আগামী অর্থবছরে লোকসানের এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল নীতির কারণে প্রতিবছরই বিদ্যুৎখাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে। গত সাত বছরের ব্যবধানে এই খাতে ভর্তুকি বেড়ে দাঁড়াবে সাত গুণেরও বেশি, শতকরা হিসেবে যা ৬৩৩ শতাংশ। যেমন ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বিদ্যুৎখাতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছিল আট হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা। সেখানে আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে এই ভর্তুকি পরিমাণ গিয়ে ঠেকবে ৬৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশী-বিদেশী কোম্পানি থেকে অস্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার কারণে প্রতি বছর বিদ্যুৎখাতে ভর্তুকি বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। যেমন ২০২১-২০২২ অর্থবছরে এখাতে ভর্তুকি দেয়া লাগছে এগারো হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। এরপরের অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ২৩ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে তা এক লাফে ১০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে তা দ্বিগুণের মতো আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২০২৬) তা হবে ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের ভাষ্য হচ্ছে, জয়েন্ট ভেঞ্চারে স্থাপিত ৩টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (ইঈচঈখ, ইওঋচঈখ, জঘচখ), সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি এবং আদানি পাওয়ার ঝাড়খাণ্ডসহ ভারত ও নেপাল হতে বিদ্যুৎ আমদানির বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল হতে জুন পর্যন্ত ১৮ হাজার ৫৩৭.৪৯ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হবে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎখাতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। উক্ত বরাদ্দ হতে ইতোমধ্যে ৩২, ১১০.২৯ কোটি টাকা পাওয়া গিয়েছে এবং (৩৬,০০০,০০-৩২,১১০,২৯) = ৩২৮৯.৭১ কোটি টাকা অবশিষ্ট রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে শেষ তিন মাসে অর্থ বিভাগের বরাদ্দের অতিরিক্ত ১৮,৫৩১.৮৯ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এ ছাড়াও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাবিউবোর (বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড) সম্ভাব্য ঘাটতির (লোকসান) পরিমাণ ৬৫ হাজার ৫৫৪.৮৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কর্তৃক সম্প্রতি নির্ধারিত তরল জ্বালানির বর্ধিত মূল্য অনুযায়ী বর্ধিত ঘাটতি ১১ হাজার ২৬৩.৫১ কোটি টাকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর ভর করে উৎপাদন সক্ষমতা পাঁচ গুণের বেশি বাড়ানোর পর লোকসান দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো পিডিবির লোকসান এক হাজার কোটি টাকা ছাড়ায়। গত ১৭ বছর ধরে পিডিবি টানা লোকসানের মধ্যেই আছে।
এ দিকে, আওয়ামী লীগের সময় বিদ্যুৎখাতের দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে কেউ কথা না বলতে পারে তার জন্য একটি ‘বিশেষ আইন’ করা হয়। ‘বিশেষ বিধান’ আইনের আওতায় সম্পাদিত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো দেশের স্বার্থে নয়; বরং ব্যক্তি বিশেষকে সুবিধা দেয়ার জন্য করা হয়েছিল। এর ফলে বিপিডিবি এখন দেউলিয়ার পথে এবং সামগ্রিক বিদ্যুৎখাত ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সূত্র: নয়া দিগন্ত
