এক দশক পর শ্রমিক অধিকারে বিশ্বের শীর্ষ ১০ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা থেকে মুক্ত বাংলাদেশ

ট্রেড ইউনিয়ন সংস্কারের পর শ্রমিকদের জন্য বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বাংলাদেশ; তবে অধিকার রক্ষা গ্রুপগুলোর সতর্কবার্তা-শ্রমিকরা এখনও নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। নতুন একটি বৈশ্বিক শ্রম অধিকার জরিপ অনুযায়ী, সাবেক স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ধারাবাহিক কিছু শ্রম সংস্কারের ফলে বাংলাদেশ প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো শ্রমিক অধিকারের ক্ষেত্রে বিশ্বের ১০টি শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন (আইটিইউসি) কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক ‘বৈশ্বিক অধিকার সূচক ২০২৬’-এ বলা হয়েছে, শ্রমিক সুরক্ষায় সর্বনিম্ন ক্যাটাগরিতে থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আর বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ পারফর্ম করা দেশগুলোর তালিকায় নেই। এটি একই সাথে অগ্রগতি এবং বিদ্যমান কাঠামোগত সমস্যা-উভয়কেই তুলে ধরে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে আনা শ্রম সংস্কারের ফলে এই উন্নতি হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলোর মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে বাধা-নিষেধ কমানো হয়েছে, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং ঐতিহাসিকভাবে আনুষ্ঠানিক সুরক্ষা থেকে বাদ পড়া খাতগুলোর জন্য শ্রম অধিকারের পরিধি বাড়ানো হয়েছে।

এর আগে, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে চাওয়া শ্রমিকদের কোনো প্রতিষ্ঠানের মোট কর্মীবাহিনীর অন্তত ২০% এর সমর্থন নিশ্চিত করতে হতো। ২০২৫ সালের শেষের দিকে প্রবর্তিত সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের আকারের ওপর ভিত্তি করে এখন সর্বনিম্ন ২০ জন শ্রমিকের সমর্থন থাকলেই ইউনিয়ন গঠন করা যাবে। এর মাধ্যমে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের সমালোচিত একটি বাধা দূর হলো। এই সংস্কারগুলোর মাধ্যমে গৃহকর্মী এবং কৃষি শ্রমিকদের জন্য আইনি সুরক্ষাও সম্প্রসারিত করা হয়েছে, ১২০ দিনের বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি চালু করা হয়েছে এবং বাংলাদেশের অন্যতম বিতর্কিত জাহাজভাঙা (শিপব্রেকিং) শিল্পকে শ্রম নীতিমালার আওতায় আনা হয়েছে। তবে এই সংস্কারগুলো সত্ত্বেও, বাংলাদেশ এই সূচকে তার সর্বনিম্ন সম্ভাব্য রেটিং ‘৫’-এ অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ এখনও ‘অধিকারের কোনো নিশ্চয়তা নেই’ এমন ক্যাটাগরিতে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই রেটিং পাওয়া দেশগুলোর শ্রমিকদের কাগজে-কলমে আইনি অধিকার থাকলেও রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন, দুর্বল প্রয়োগ ব্যবস্থা এবং মালিকপক্ষের প্রতিরোধের কারণে তারা সেগুলো প্রয়োগ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ ধর্মঘট ও ইউনিয়নের কার্যক্রম দমন করা অব্যাহত রেখেছে, বিশেষ করে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে, যা বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর অন্যতম।

প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের এপ্রিলের একটি ঘটনার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বাইরে বকেয়া মজুরি ও বোনাসের দাবিতে আন্দোলনরত পোশাক শ্রমিকদের ওপর পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে, যার ফলে বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহত হন। আইটিইউসি আরও জানিয়েছে যে, বাংলাদেশের শ্রমিকরা বিশেষ করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে (এসইজেড) অবাধে সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে এখনও বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন, যেখানে অ্যাসোসিয়েশন বা সংগঠন করার স্বাধীনতার ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। শ্রমিক অধিকার কর্মীরা বৈশ্বিক শীর্ষ ১০টি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের বাদ পড়াকে স্বাগত জানালেও সতর্ক করেছেন যে, কেবল আইনি সংস্কারই গভীর কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করবে না।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ এই অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছেন, তবে যুক্তি দিয়েছেন যে প্রশাসনিক জটিলতা এখনও বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে। তিনি বলেন, ছোট কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের জন্য ইউনিয়ন নিবন্ধন করা এখনও কঠিন, কারণ কিছু কর্মক্ষেত্রে নিবন্ধনের আগে এখনও ৪০% শ্রমিকের সমর্থনের প্রয়োজন হয়। সূত্র: ইনকিলাব

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট