সম্পাদকীয়

বস্তিবাসী ও পথশিশুদের সমাজের মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে

আমাদের সমাজে নীতি-নৈতিকতা ও সামাজিক-পারিবারিক মূল্যবোধ দিন দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে। নানা ধরনের অপরাধ প্রবণতা থেকে শুরু করে অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিরায়ত যে শাসন-বারণ ও মূল্যবোধ নিয়ে আমাদের সমাজ গঠিত, তা আজ ক্ষয়িষ্ণুতার দিকে ধাবিত। একটি শিশুর সুনাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠার জন্য যে পারিবারিক-সামাজিক রীতি-নীতির বন্ধন অপরিহার্য, তা বলতে গেলে নেই হয়ে যাচ্ছে। আমাদের শহুরে সভ্য বা ক্ষয়ীষ্ণু মূল্যবোধের সমাজের পাশাপাশি সমান্তরালভাবে গড়ে উঠেছে দরিদ্র শ্রেণীর সমাজ, যারা মূলত বস্তিতে বসবাস করে। তাদের এই জগতকে সভ্যসমাজ খুব একটা গুরুত্ব দিতে চায় না। বরং অনেকটা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে দেখে। অথচ এই বস্তিসমাজের নেতিবাচক কর্ম সভ্য সমাজে প্রায়ই বিরূপ প্রভাব ফেলে। দেশে যে সমাজে সন্ত্রাস ও মাস্তিনির আতঙ্ক দেখা যায়, তার বেশিরভাগই বস্তি থেকে উঠে আসা। এখন যে পড়ায় পাড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, তাতেও বস্তি থেকে উঠে আসা কিশোররা বড় ভূমিকা রাখছে। দেশে বিশৃঙ্খলা ও অপরাধ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই বস্তিসমাজের ভূমিকা রয়েছে। বস্তিতে বেশিরভাগই নদীভাঙ্গন, কিংবা কাজের সন্ধানে শহরে আসা অতিদরিদ্ররা বসবাস করে। এদের প্রায় সবাই দিনমজুর, রিকশাচালক, গার্মেন্ট শ্রমিক, বাসাবাড়ির কাজের লোক। ফলে তারা তাদের সন্তানদের ঠিকমতো দেখাশোনা করে বড় করতে পারে না। সকালে কাজে বের হয়ে রাতে ফিরে। এ সময়ে তাদের সন্তান কি করছে, কীভাবে কাদের সাথে মিশে বড় হচ্ছে, তার খোঁজ নেয়া সম্ভব হয় না। এসব সন্তানের অনেকেই নানা অপরাধ এবং মাদকের বাহক ও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। তাদের অনেকের বার্থ সার্টিফিকেট বা জন্মসনদ নেই। গতকাল দৈনিক ইনকিলাবের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের বস্তি ও পথশিশুদের বড় একটি অংশ জন্মনিবন্ধনের বাইরে রয়ে গেছে। বেসরকারি সংস্থা কারিতাসের করা ২০২৫ সালের এক জরিপে বলা হয়েছে, পথে বেড়ে ওঠা শিশুদের ৫৮.২ শতাংশের জন্মসনদ নেই। জন্মনিবন্ধন না থাকায় তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না। পথশিশুদের ৫১.৬ শতাংশ শিক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। অবহেলিত ও উপেক্ষিত এসব নাগরিককে দেখভালের কেউ নেই। ফলে তাদের অনেকে বিভিন্ন অপরাধ ও মাকাসক্তে পরিণত হয়ে সমাজের জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠছে। বস্তিতে ও ফুটপাতে বেড়ে উঠা শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই ধাবিত হয়। তাদের ভবিষ্যৎ বলতে কিছু নেই। বস্তিতে যে শিশুটি জন্মগ্রহণ করে, জীবনরক্ষার তাগিদে তার মা-বাবাকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। তাকে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে ও গাইড করে সুসন্তান হিসেবে গড়ে তোলার মতো অবস্থা তাদের থাকে না। এই বাস্তবতার কারণে এসব শিশু যথাযথভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। তাদের অধিকাংশ বিপথে চলে যায়। মাদক বা অপরাধজগতের সাথে জড়িয়ে পড়ে। সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। অথচ তারা আমাদের এই সমাজেরই অংশ, আমাদের সন্তানের মতো। তাদের জীবন সুন্দরভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। এসব বস্তি ও পথশিশুদের খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। রাষ্ট্রের চোখে সকল নাগরিক সমান হলেও রাষ্ট্রপরিচালকরা এই নাগরিকদের প্রতি কখনোই যথাযথভাবে দৃষ্টি দেয় না। রাষ্ট্রের এই ব্যর্থতা ও বৈষম্যমূলক আচরণে বস্তি ও পথশিশুদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বিরাজমান এবং তা সমাজ ও রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা-স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি স্বরূপ। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য অবহেলিত ও উপেক্ষিত বস্তিবাসী ও পথশিশুদের সুন্দর জীবন নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। সরকারকে তাদের সবধরনের নাগরিক সুবিধা দিতে হবে। যে বিশাল সংখ্যক শিশু জন্মনিবন্ধনের বাইরে রয়েছে, তাদের নিবন্ধন করে মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাদের বাইরে রেখে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট