রুয়েট প্রশাসনের নীরবতায় জুলাই যোদ্ধাদের ওপর হামলা মামলার আসামিরা বহাল তবিয়তে
স্টাফ রিপোর্টার
রাজশাহীতে বহাল তবিয়তে আছে জুলাই যোদ্ধাদের হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা মামলার আসামিরা। এজাহারভুক্ত আসামিদের একটি অংশ সরকারি ও বেসরকারি অফিস এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দিব্যি চাকরিও করছেন। এসব আসামিকে রক্ষা করছেন নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের আওয়ামীপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তারা। অভিযোগ রয়েছে, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামীপন্থী চার অফিসারকে আগলে রেখেছেন দুইজন শিক্ষক ও একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জুলাই যোদ্ধা ও নগরীর ধরমপুর এলাকার আমানুল্লাহ আমানের দায়ের করা মামলায় আসামি নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা রাইসুল ইসলাম রোজসহ চার নেতাকর্মী এখনো রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) স্বপদে বহাল আছেন। ছাত্রলীগ নেতা রোজ ছাড়াও এ মামলার অন্য তিন এজাহারভুক্ত আসামি হলেন, রুয়েটের হিসাব শাখার জুনিয়র অডিট অফিসার ও ৩ নম্বর আসামি রফিকুল ইসলাম বিপু, গবেষণা ও সম্প্রসারণ দপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ও মামলার ৪ নম্বর আসামি মুফতি মাহমুদ রণি এবং মামলার ৯ নম্বর আসামি ও টেকনিক্যাল অফিসার মাহাবুব সালাম সেতু।
তারা গ্রেপ্তার এড়াতে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন। কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকায় নিয়ম অনুযায়ী তাদের সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া রেজিস্ট্রার আরিফ আহমেদ চৌধুরীর ছত্রচ্ছায়ায় বহাল তবিয়তে আছেন আসামিরা। ৫ আগস্ট সরকারবিরোধী আন্দোলন চলাকালে হামলায় অংশগ্রহণের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানায় মামলা করেন জুলাই যোদ্ধা ও নগরীর ধরমপুর এলাকার আমানুল্লাহ আমান। মামলার পর থেকে আসামিরা পলাতক ছিলেন। পলাতক থাকা অবস্থায় তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়নি। বরং তাদের পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, রাইসুল ইসলাম রোজ ২০০৮-২০০৯ সেশনের নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের রুয়েট শাখার সভাপতি ছিলেন। তৎকালীন রুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম সেখ বিতর্কিত নিয়োগের মাধ্যমে রুয়েটের গবেষণা ও সম্প্রসারণ দপ্তরে সেকশন অফিসার হিসেবে রোজকে নিয়োগ দেন। সংগঠনটির নেতৃত্বে থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে রুয়েটের আবাসিক হলে শিক্ষার্থী নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
মামলার পর দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার পর সম্প্রতি রুয়েট রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে তার যোগদানের বিষয়ে বলা হয়েছে। ৫৫৭০ নম্বর স্মারকসংবলিত বিজ্ঞপ্তিতে ‘কর্তব্য-কর্মে যোগদান প্রসঙ্গে’ শিরোনামে রাইসুল ইসলামের পুনরায় স্বীয় পদে কর্মস্থলে যোগদানপত্র গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের ২০২৩ সালের ৩১ আগস্টের অনুসন্ধান নথিতে তৎকালীন রুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম সেখের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকায় রাইসুল ইসলাম রোজের নাম রয়েছে।
এদিকে একই হামলা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি রফিকুল ইসলাম বিপু ও মুফতি মাহমুদ রণিও বর্তমানে রুয়েটে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
মামলার বাদী আমানুল্লাহ আমান জানান, অনেক আশা নিয়ে মামলা করেছিলেন, বিচার পাবেন। কিন্তু বাদীকে সহযোগিতা না করে উল্টো আসামিদের সহযোগিতা করছেন রুয়েট কর্তৃপক্ষ। রুয়েটে কর্মরত আসামিদের অধিকাংশ এখন স্বপদে বহাল। বিষয়টি বাদীকে কষ্ট দেয় বলে জানান। অবিলম্বে আসামিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান বাদী আমান।
এদিকে, ৫ জুলাই রাজশাহীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের খরবোনা এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা, বোমাবাজি ও গুলির ঘটনায় আহত জুলাই যোদ্ধা সজান বাদী হয়ে ১৪৮ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় ৩ নম্বর আসামি রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগে কর্মরত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সাংসদ শফিকুর রহমান বাদশার ছেলে মাহমুদুর রহমান দ্বীপন। দ্বীপনও স্বপদে বহাল রয়েছেন। মামলার এজাহারে ৩ থেকে ৩৯ নম্বর আসামির হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে ছাত্র-জনতার দিকে গুলি ছোড়ার অভিযোগ রয়েছে। এজাহার অনুসারে দ্বীপনের হাতেও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।
জুলাই যোদ্ধা ও বিএনপিপন্থী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, হত্যার উদ্দেশ্যে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা গ্রেপ্তার এড়িয়ে এবং প্রশাসনিক শাস্তির মুখোমুখি না হয়ে কীভাবে স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। জুলাই যোদ্ধাদের অভিযোগ, পুরো রুয়েট নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অভয়ারণ্য। রুয়েট প্রশাসনের নমনীয়তার কারণে আবারও তারা বিভিন্ন স্থানে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন এবং মাথাচাড়া দিয়ে উঠছেন। ২০২৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া রেজিস্ট্রার আরিফ আহমেদ চৌধুরী এসব আসামিকে বাঁচাতে মরিয়া বলে অভিযোগ উঠেছে।
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এস. এম. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কিছু কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্যরা অসুস্থজনিত ছুটির আবেদন করেছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে মেডিকেল বোর্ড বসিয়ে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সম্প্রতি যাদের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ উঠেছে, তাদের সম্পর্কে রুয়েটের কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে পুলিশ প্রশাসনকে জানানো হয়েছে, রুয়েটের যেসব কর্মকর্তার নাম আসছে, তাদের সম্পর্কে তথ্য দিতে। পুলিশের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
