পাপের কারণেই বিশ্বজুড়ে বিপর্যয়, তাওবা ও প্রকৃত তাকওয়া অবলম্বনই পরিত্রাণের একমাত্র উপায়
ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে, মহান আল্লাহ তাআলার রহমত ও বরকত কোনো বান্দা বা সমাজের ওপর থেকে হুট করে তুলে নেওয়া হয় না। মূলত মানুষের নেতিবাচক কর্ম ও পাপাচারের ফলেই আমাদের জীবন এবং সমাজ থেকে রহমত ও বরকত হ্রাস পায়। গতকাল শুক্রবার (১৭ জুলাই) রাজধানীর মহাখালীস্থ মসজিদে গাউছুল আজমের জুম্মাপূর্ব বয়ানে খতীব আলহাজ্ব মুফতী মাওলানা মাহবুবুর রহমান এ সব কথা বলেন।
উপস্থিত মুসল্লিদের সামনে মহান আল্লাহর গজব এবং রহমত-বরকতের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে খতীব বলেন, আমাদের পাপাচারের দরুন আজ বিশ্বব্যাপী নানাবিধ বিপর্যয় নেমে এসেছে। বর্তমান সময়ের সবথেকে ভয়ংকর প্রাকৃতিক সংকটের অন্যতম হলো ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বা বৈশ্বিক উষ্ণতা। ক্রমশ আমাদের বায়ুমন্ডল ভারি হয়ে আসছে। অক্সিজেনের তুলনায় কার্বন ডাই-অক্সাইড ও বিষাক্ত নাইট্রোজেন গ্যাস পুরো বিশ্বকে ঘিরে রেখেছে। এর প্রভাবে পৃথিবীর কেন্দ্র ও পৃষ্ঠের উত্তাপ বাইরে যেতে পারছে না, যার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র তাপপ্রবাহ। আজ থেকে ১৪০ বছর পূর্বে এমন প্রতিকূল আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘এলনিনো’ নামে নামকরণ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণতা এতটাই অস্বাভাবিক আকার ধারণ করেছে যে, তা বিগত সকল রেকর্ড ভেঙে দিচ্ছে। পরিবেশ, জলবায়ু ও ভূগোলবিদগণ একে এখন ‘সুপার এলনিনো’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। বিশ্লেষক ও গবেষকদের মতে সুপার এলনিনোর প্রভাবে সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রতিবেশী দেশ ভারতীয় নাগরিকরা এবং দেশটির অর্থনীতি। খতীব বলেন, এটি কি কেবলই প্রাকৃতিক বিপর্যয়? কেবলই কি বনায়নের স্বল্পতা ও অতিরিক্ত বায়ু দূষণের কারণে এমনটি হচ্ছে? এর উত্তর হলো “না”। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা আর-রুমের ৪১ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট বলেছেন, মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে আল্লাহ তাদেরকে তাদের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।
তিনি আরও বলেন, সুপার এলনিনোর প্রভাবে ইতিমধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে, যার ফলে পানির আয়তন বাড়ছে। গবেষকদের মতে, এই বর্ধিত জলরাশি কোন দিকে প্রবাহিত হবে বা কোন জনপদকে গ্রাস করবে, তা কেউ বলতে পারে না। সাবমেরিন ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখা গেছে, প্রশান্ত মহাসাগরের অগভীর তলদেশে বিশাল বিশাল পাহাড় ও প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। হয়তো কোনো একসময়ে মহাসাগরের এমন বিরূপ আচরণেই কোনো প্রাচীন সভ্যতার সলিল সমাধি হয়েছিল। শুধু প্রশান্ত মহাসাগরই নয়, আটলান্টিক ও উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকার মহাসাগরগুলোতেও এমন বহু নিদর্শন রয়েছে। আজ বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার যুগেও প্রশান্ত মহাসাগরের সম্পূর্ণ বিস্তীর্ণতা ও গভীরতা পরিমাপ করা সম্ভব হয়নি। এমন একটি মহাসাগরের অসীম জলরাশি যেদিকে ধাবিত হবে, সেখানে কোনো প্রাণীর বেঁচে থাকা অসম্ভব। এই ধরণের মহাসাগরীয় পরিবর্তন আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা। এছাড়া সাইক্লোন, টর্নেডো, ভূমিকম্প, দাবানল কিংবা পানিও বাতাসে ভাইরাসের সংক্রমণ—এসবই মানুষের হাতের কামাই। মুফতী মাহবুবুর রহমান আলোচনা প্রসঙ্গে আল্লাহর অসীম কুদরতের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, পাপাচারের কারণে যেমন আল্লাহ আবহাওয়াকে আমাদের প্রতিকূলে নিয়ে শাস্তি দিতে পারেন, ঠিক তেমনি নেক আমলের দরুন এই আবহাওয়া ও প্রকৃতি দ্বারা তিনি রহমত নাযিলের মাধ্যমে আমাদের পরিত্রাণ দিয়ে সমৃদ্ধশালী করতে পারেন।
এর বাস্তব উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মরুভূমি সাহারায় আজ নজিরবিহীন বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তপ্ত বালু রাশি খনন করে পাওয়া যাচ্ছে সুপেয় পানির বিশাল জলাধার, যা মানুষ কখনো কল্পনাও করেনি। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ভূমিকম্পের পর মাটির তলদেশ থেকে আবিষ্কৃত হচ্ছে তেল, স্বর্ণসহ মূল্যবান খনিজ সম্পদ। এসব কি আল্লাহর রহমত ও বরকতের দৃষ্টান্ত নয়? এসব কি আল্লাহর ক্ষমতা ও পরাক্রমশালীতার নিদর্শন নয়? খতীব বলেন, মনে রাখবেন এই কূল-কায়েনাতের স্রষ্টার কোনো সাহায্যকারীর প্রয়োজন নেই। তিনি যখন যা ইচ্ছে করেন, কেবল বলেন ‘হয়ে যাও’ (কুন), আর সঙ্গে সঙ্গে তা হয়ে যায় (ফায়াকুন)। আমাদের অস্তিত্ব থাকা বা না থাকায় আল্লাহর কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি নেই, বরং আমাদের প্রতি মুহূর্তে আল্লাহকে প্রয়োজন। আল্লার অনুগ্রহ ব্যাতিত কোন সৃষ্টিই টিকে থাকতে পারে না। তিনি যেমনিভাবে সকল কিছু সৃষ্টি করেছে, অনূরূপ ধ্বংসও করতে পারেন। কেন মানুষের জীবন থেকে বরকত ও নেয়ামত কমে যায়, তার ব্যাখ্যায় খতীব হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, মানুষ তার নিজের কৃত পাপের কারণেই তার জন্য নির্ধারিত রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা ইব্রাহিমের ৭ নং আয়াতে ঘোষণা করেছেন, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের নেয়ামত বাড়িয়ে দেবো; আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে মনে রেখো আমার শাস্তি অবশ্যই কঠোর। অপর এক আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, আর যদি সে সব জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অবলম্বন করত, তবে আমি অবশ্যই তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম (সূরা আল-আ’রাফের ৯৬)। হতাশ না হয়ে আল্লাহর দরবারে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে খতীব হাদীসের উদ্বৃতি দিয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন- নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার গযবের ওপর প্রাধান্য লাভ করেছে (সহীহ মুসলিম: ২৭৫১)। এই হাদীসের বর্ণনা দ্বার আমরা বুঝতে পারি, বিপর্যয় যতই আসুক না কেন, আল্লাহর রহমত যেকোনো বালা-মুসিবতের চেয়ে অনেক বড়। তাই ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে আল্লাহর রহমত ও বরকত ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার পাঠ করতে হবে। তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অবলম্বন করতে হবে। আল্লহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করতে হবে। সর্বদা হালাল উপার্জনে মনোযোগী হতে হবে।
খতীব মাওলানা মাহবুবুর রহমান অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের সমাজে সপ্তাহের কেবল জুম্মার নামাজ ব্যতীত অন্য ওয়াক্তের নামাজে মসজিদে পর্যাপ্ত মুসল্লি পাওয়া যায় না। অথচ এই নামাজই বান্দার সাথে মহান আল্লাহর সেতুবন্ধন তৈরি করে এবং কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাজেরই হিসাব নেওয়া হবে। আল্লাহ আমাদের দ্বীনের পথে কবুল করুন। আমাদের কৃতকর্মের সংশোধনের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের তাওফিক দান করুন। আমীন। সূত্র: ইনকিলাব
