সম্পাদকীয়

মেধাপাচার রোধে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে

দেশে প্রতিবছর সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিভিন্ন সাবজেক্টে উচ্চশিক্ষা নিয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বের হচ্ছে। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে এদের বেশিরভাগই দীর্ঘসময় বেকার থেকে যাচ্ছে। অনেকে ভালো ভালো সাবজেক্টে পড়াশোনা করলেও তা কাজে লাগানোর সুযোগ না থাকায় হতাশ হয়ে পড়ে। অনেকে যে সাবজেক্টে পড়াশোনা করেছে, বেকারত্ব ঘুচানোর জন্য বাধ্য হয়ে অন্য সাবজেক্টের ক্ষেত্রে ঢুকে পড়ছে। যে বিজ্ঞান বিভাগে পড়েছে, সে ব্যবসা বা বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে চাকরি খুঁজে নেয়। ফলে তার পড়াশোনা করা সাবজেক্টের জ্ঞান তার সংশ্লিষ্ট খাতে কাজে লাগাতে পারছে না। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আকর্ষণীয় ও উন্নত বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে সে পড়াশোনা কাজে লাগানোর কোনো সুযোগ নেই। এদের মধ্যে যারা মেধাবী, গবেষণাকাজে নিজেকে আরও অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চায়, তারা স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশের বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যায়। সেখানে উন্নত শিক্ষা গ্রহণ করে ওই দেশেই থেকে যায়। দেশে ফিরে আসে না। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোও তাদের গবেষণা ও কাজের সুযোগ এবং উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা দিয়ে রেখে দেয়। এভাবে বছরের পর বছর দেশ থেকে মেধাপাচার বা ব্রেইন ড্রেইন হয়ে যাচ্ছে। এতে মেধার দিক থেকে দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে। মেধাবীদের এভাবে দেশ ছেড়ে যাওয়ার মূল কারণ হচ্ছে, বিদেশে উন্নত কর্মপরিবেশ, গবেষণার বিস্তৃত সুযোগ, উচ্চ বেতন, স্থায়ী বসবাসের সুযোগ এবং উন্নতমানের জীবনের নিশ্চয়তা। মেধাবীদের দেশে ফিরে না আসার অন্যতম কারণ হচ্ছে, সীমিত গবেষণা, দক্ষতাস¤পন্ন কর্মসংস্থান সংকট ও অনিরাপদ পরিবেশ এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়নে যথাযথ ক্ষেত্র তৈরি না হওয়া। দেশ থেকে মেধাবীদের চলে যাওয়া এবং বিদেশে কর্মরত মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারকে শুধু মুখে মুখে আহ্বান জানালে হবে না, এজন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। দেশে ফিরে আসার ক্ষেত্রে তাদের আকৃষ্ট করতে তাদের উপযোগী ক্ষেত্র তৈরি এবং সবধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। চীন বিশেষ ট্যালেন্ট প্রোগ্রাম, গবেষণা অনুদান, আবাসন সুবিধা, প্রতিযোগিতামূলক বেতন এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদেশফেরত গবেষকদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। সিঙ্গাপুর উচ্চমানের শিক্ষা ও গবেষণা পরিবেশ, দক্ষিণ কোরিয়া গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং আয়ারল্যান্ড বহুজাতিক বিনিয়োগ এবং জ্ঞানভিত্তিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের মাধ্যমে দক্ষ মানবস¤পদ ধরে রাখতে সফল হয়েছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, মেধা ধরে রাখতে শুধু দেশপ্রেমের আহ্বান নয়, প্রয়োজন উন্নত গবেষণা, প্রতিযোগিতামূলক কর্মপরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। আমাদেরও পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। দেশে অনেক মেধাবী রয়েছে। তাদের ক্ষেত্র অনুযায়ী, গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ, কর্মক্ষেত্র তৈরিসহ বিশেষ যত্ন নিতে হবে। প্রতিনিয়ত প্রযুক্তির যে পরিবর্তন হচ্ছে, তার সাথে তাল মেলাতে এবং গবেষণা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাদের কাজে লাগাতে হবে। যেসব মেধাবী বিদেশের বিভিন্ন বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, তাদের চাহিদা অনুযায়ী সুবিধা নিশ্চিত করে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশে আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা, গবেষণার পরিবেশ এবং উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে মেধাবীদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা কমানো সম্ভব। নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, মেধার মূল্যায়ন, গবেষণার স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে তরুণদের জন্য আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে স্টার্টআপ, উদ্ভাবন ও গবেষণাভিত্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন, নীতিগত সহায়তা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। আমরা আশা করি, সরকার দেশের মেধাবীদের ধরে রাখার জন্য সময়োপযোগী পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেবে।
 

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট