সম্পাদকীয়

পানিচুক্তির নবায়ন : সতর্ক থাকতে হবে

খুব ঘটা করে ১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিচুক্তি সম্পাদন করে। ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তিটি ছিল অসম। সমতার ভিত্তিতে নয়, ভারতের একতরফা স্বার্থের অনুকূলে চুক্তিটি সম্পাদিত হয়। পানিবিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা চুক্তির বিষয়ে অত্যন্ত নেতিবাচক মন্তব্য করেন। তাদের মতে, চুক্তিটি অসম্পূর্ণ ও শুভংকরের ফাঁকি ছাড়া আর কিছুই নয়। ‘যদি’ আক্রান্ত এ চুক্তি কার্যকর-অযোগ্য এবং লোক দেখানো দলিলমাত্র। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের পানিপ্রাপ্তির কোনো নিশ্চয়তা নেই। নিশ্চয়তা আছে ভারতের। ভারত পানি বেশি পাবে, বাংলাদেশ পাবে কম। চুক্তিতে আরবিট্রেশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। সবকিছু নির্ভর করবে ভারতের ইচ্ছার ওপর। চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে কোনো গ্যারান্টি ক্লজ নেই। আছে ভারতের পক্ষে। চুক্তির এসব বৈশিষ্ট্য থেকে এটা স্পষ্ট, চুক্তিটি একপেশে ও ভারতের স্বার্থানুকূল। চুক্তির নামে নতজানুতা কী হতে পারে, এটা তার প্রমাণ। এই পানি চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ খুব কমই পানি পেয়েছে। এক পরিসংখ্যান মতে, ৩০ বছরের মধ্যে ২৩ বারই বাংলাদেশ ন্যায্য পানি পায়নি। ফলে পদ্মার পানির ওপর নির্ভর করে গড়ে তোলা জিকে প্রজেক্টের অধীন কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি না পাওয়া এবং কৃষিসহ নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নিয়ে বাংলাদেশের তরফে অনেক কথা ও উদ্বেগ জানানো হয়েছে ভারতকে। ভারত তাতে কর্ণপাত করেনি। ১৯৯৬ সালে সম্পাদিত সেই চুক্তির মেয়াদ এ বছর ডিসেম্বরে শেষ হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে চুক্তি নবায়ন করার প্রয়োজন হবে। চুক্তি নবায়ন করার বিষয়ে বাংলাদেশ আগ্রহ দেখালেও ভারত এখন পর্যন্ত নিরবতা দেখিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের আগ্রহের প্রধান কারণ, চুক্তিতে যে অসমতা রয়েছে, অসম্পূর্ণতা রয়েছে, ত্রুটি রয়েছে, তা নবায়িত চুক্তিতে সংশোধন করে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা, সমস্বার্থ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের এই ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত আগ্রহ বা অভিপ্রায় কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ রয়েছে। সম্প্রতি পিটিআই পরিবেশিত এক খবরে জানানো হয়েছে, গঙ্গার পানিচুক্তি নবায়নের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার একটি সতর্ক বার্তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারকে। রাজ্যের এক জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তার বরাতে জানানো হয়েছে, রাজ্যের পানি সম্পদ, বন্দর ও শিল্প খাতের স্বার্থ যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। পিটিআইকে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আমাদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো, নবায়িত কোনো চুক্তিতে যেন রাজ্যের ন্যায্য প্রয়োজনীয়তাগুলো পর্যাপ্তভাবে সুরক্ষিত থাকে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ভাগীরথী-হুগলি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত পানি পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। তিনি আরো উল্লেখ করেছেন যে, হুগলি নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে নৌচলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে ফারাক্কা ব্যারাজের উজান-ভাটিতে মালদা, মুর্শিদাবাদ ও নদীয়া ব্যাপক নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই অভিমতকে প্রাধান্য দিয়ে নবায়িত চুক্তি হলে তা কেমন হবে, সহজেই অনুমেয়। পানিচুক্তি নিয়ে ভারতের মাইন্ডসেটের যে এতটুকু পরিবর্তন হয়নি, এ অভিমতে তাও প্রমাণিত। বাংলাদেশ গঙ্গার পানিচুক্তির নবায়ন চায়। নবায়ন হলে চুক্তির সংগত সংশোধনের একটা সুযোগ পাবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বা ভারত যেভাবে ছক কষছে, তাতে ভারতের স্বার্থই আরো সংহত ও বর্ধিত হওয়ার আশংকা থেকে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে তার স্বার্থ সমুন্নত করার ক্ষেত্রে অনড় ও দৃঢ় থাকতে হবে। কোনো রূপ ছাড় দেয়ার চিন্তা পরিহার করতে হবে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার যে, গঙ্গায় পানিপ্রবাহ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এর কারণ, গঙ্গার পানির নির্বিচার প্রত্যাহার। ১৯৯৬ সালে যখন চুক্তি হয় তখন মূল প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে বণ্টনের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি। ফারাক্কা পয়েন্টে প্রাপ্ত পানির ভিত্তিতে বণ্টনের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। উজান থেকে ব্যাপক পানি সরিয়ে নেয়ার পর ফারাক্কা পয়েন্টে অবশিষ্ট যে পানি আসে তাতে দু’দেশের প্রয়োজন পূরণ হয় না। গঙ্গার পানি সংকটের এটাই বড় কারণ। এ পানি সংকট নিরসন করতে হলে এর প্রবাহ বাড়াতে হবে, পানি ছিনতাই রহিত করতে হবে। এছাড়া কোনো সহজ সমাধান নেই। এর বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশের একটি প্রস্তাব ছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল— এই তিন দেশের উদ্যোগে নেপালে ত্রিদেশীয় রিজার্ভার নির্মাণ করে পানি সংরক্ষণ করা হবে এবং শুষ্ক মৌসুমে সেই পানি ছেড়ে দিয়ে তিন দেশের পানির চাহিদা পূরণ করা হবে। শুধু তাই নয়, ওই প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছিল, এই রিজার্ভারকে কেন্দ্র করে যে পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে, তা তিন দেশের চাহিদা পূরণ করবে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ভারত বাংলাদেশের এ প্রস্তাব মানেনি। ফলে, পানি ও বিদ্যুৎ সমস্যার সহজ সমাধান হয়নি। আমরা গঙ্গার ন্যায্য পানিচুক্তির পাশাপাশি তিস্তার পানিচুক্তিসহ সব নদীর পানিচুক্তি প্রত্যাশা করি। সব চুক্তিতেই যেন দু’দেশের স্বার্থ সমভাবে প্রাধান্য পায়, সে নিশ্চয়তাও চাই।
 

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট