সম্পাদকীয়

সীমান্তে পুশইন রুখতে হবে

ভারতে বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা কোনো নতুন বিষয় নয়। বিশেষত বিজেপি নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদী শাসন শুরু হওয়ার পর থেকে এ ধরনের তৎপরতা অনেক বেড়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্ধ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনামলেও প্রায়শ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় বিজেপি নেতাদের বাংলাদেশ বিরোধী উস্কানিমূলক বক্তব্য শোনা গেছে। বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী অর্ন্তবর্তী সরকারের সময় ভারতীয়দের বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা উলঙ্গভাবে ধরা পড়ে। শুধু প্রপাগান্ডা বা রাজনৈতিক বক্তব্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকেনি, বাংলাদেশে আগ্রাসন চালানোর হুমকিও দেয়া হয়েছে। কথিত সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট(সিএএ), এনআরসি’র নামে লাখ লাখ ভারতীয়ের নাগরিকত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার অপতৎপরতা শুরু হয়েছে বিজেপি’র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির হাত ধরে। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের আগে স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর-এর নামে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৯০ লাখ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বিজেপি নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত করে। গতমাসে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি শাসন শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ’র নানামুখী অপতৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কথিত অবৈধ নাগরিকদের সীমান্তে জড়ো করে রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে পুশ-ইন করানোর তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের সাথে কোনো আলোচনা বা বোঝাপড়া ছাড়াই, আন্তর্জাতিক আইন-কানুন ও বাংলাদেশের তীব্র আপত্তি উপেক্ষা করে রাতের অন্ধকারে সীমান্তের দুর্গম এলাকা দিয়ে বিএসএফ যাদেরকে বাংলাদেশে পুশ ইন করছে, তাদের প্রায় সবাই দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত বাংলা ভাষাভাষী ভারতীয় মুসলমান। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে হাজার কোটি ডলার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য রয়েছে, যার সিংহভাগই ভারতের অনুকুলে। মাদক ও চোরাচালান বন্ধে বিএসএফ’র তৎপরতা তেমন দৃশ্যমান না হলেও যত্রতত্র প্রাণঘাতি অস্ত্র ব্যবহার করে সীমান্তে পাখির মত মানুষ হত্যার ঘটনা বাড়িয়ে চলেছে। অভিন্ন ভাষাভাষী দুই দেশের স্থল সীমান্ত লঙ্ঘনের দায়ে পৃথিবীর কোনো সীমান্তে এভাবে গুলি করে সাধারণ নাগরিকদের হত্যা করার কোনো উদাহরণ নেই। গত দেড় দশকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ সেই দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারি, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্বশর্মা সাম্প্রতিক সময়ে কথিত অবৈধ ভারতীয়দের ঢালাওভাবে বাংলাদেশি ট্যাগ দিয়ে রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার নির্দেশনা দিয়ে যে সব বক্তব্য দিয়েছেন তা স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইন, শিষ্টাচার ও দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের লঙ্ঘন। এ বিষয়ে বাংলাদেশের আর নমনীয় থাকার সুযোগ নেই। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, সম্প্রতি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ(বিজিবি) বিএসএফ’র অন্তত তিন-চারটি পুশ-ইন প্রয়াস প্রতিরোধ করেছে। গতকাল ইনকিলাবে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়, বিজিবির প্রতিরোধের মুখে বেনাপোল সীমান্তের শুন্য রেখায় জড়ো করা অন্তত ১০-১২জন নারী-পুরষ ও শিশুকে সরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ। সীমান্তে তিক্ষè নজরদারি এবং বিএসএফ’র পুশ-ইন তৎপরতার বিরুদ্ধে বিজিবি’র প্রতিরোধ অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাবে বলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা শুধুমাত্র সীমান্ত রক্ষীদের কাজ নয়। এসব বিষয়ে সরকারকে তার অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের জনগণকেও সতর্ক হতে হবে। যে কোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সীমান্তরক্ষীদের পাশে দাঁড়িয়ে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলতে হবে। সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক এজেন্ডায় অবৈধভাবে লাখ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার হরণ করে তাদেরকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার ভয়ঙ্কর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান গ্রহণের বিকল্প নেই। শুভেন্দু ও হিমান্ত বিশ্বশর্মার বক্তব্য, ওসমান হাদীর হত্যাকারীদের নিয়ে অমিত শাহ্র হস্তক্ষেপ এবং মমতা ব্যানার্জির সাক্ষ্য ভারতের ভয়ঙ্কর বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের প্রমাণ দেয়। এসব বিষয়ে ভারত সরকারের কাছে কূটনৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট