সম্পাদকীয়

ইরান-আমেরিকা অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তি

অবশেষে বহুল প্রত্যাশিত-প্রতীক্ষিত ইরান-আমেরিকা শান্তিচুক্তির খসড়া বা অন্তর্বর্তী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত সোমবার ১৫ জুন যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের এমওইউ (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) বা সমঝোতা স্বারকে স্বাক্ষর করেন দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা। শুক্রবার জেনেভায় অন্তর্বর্তী চুক্তিতে সই করার কথা থাকলেও দু’দিন আগেই বুধবার ১৭ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। প্রথম মহাযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটানোর চুক্তিটি যে ভার্সাই প্রসাদে স্বাক্ষরিত হয়েছিল, ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ও শান্তিচুক্তির অন্তর্বর্তী চুক্তিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট সেখানেই স্বাক্ষর করেন। জি-সেভেন সম্মেলনে উপস্থিত পশ্চিমা প্রতিনিধিরা এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার সাথে সাথেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিচে নেমে গেছে। জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যবসায়-বাণিজ্য ও স্টকমার্কেটগুলোতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তবে শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষরের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্টের এক নতুন হুমকির কারণে তেলের বাজারে কিছুটা অস্থিরতার খবর পাওয়া যায়। ইরান-আমেরিকা শান্তিচুক্তিকে কার্যত সারাবিশ্ব স্বাগত জানালেও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বিরোধিতা করেছেন। মূলত নেতানিয়াহু ও জায়নিস্টদের প্ররোচণাতেই এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। যুদ্ধের শুরুতে ইসরাইল-আমেরিকা ইরানের এনরিচ্ড ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তগত করা, রিজিম বদল, ব্যালিস্টিক মিসাইল ক্যাপাসিটি ধ্বংস করাসহ যে সব লক্ষ্যের কথা বলেছিল, তিন মাসের যুদ্ধে তার কিছুই অর্জিত হয়নি। উপরন্তু মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব ঘাঁটি ও ইসরাইলের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানি হাইপারসনিক মিসাইল ও ড্রোন হামলায় চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাবে জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যনীতির ইতিহাস চরম অপরিণামদর্শিতা, অনিশ্চয়তা ও বৈপরীত্যে পরিপূর্ণ। তবে ইতিপূর্বে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইরাক-আফগান যুদ্ধ বছরের পর বছর ধরে চালিয়ে হাজার হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি ও লাখ লাখ মানুষ হত্যার ধারাবাহিকতার পুনরাবৃত্তি ইরান যুদ্ধে হয়নি। এটাই হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যতিক্রমী নেতৃত্বের উদাহরণ। ইসরাইলের জায়নিস্ট যুদ্ধবাদী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্ররোচণায় যেমন এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, একইভাবে এই শান্তিচুক্তিকে ব্যর্থ করে দিতেও তিনি সক্রিয় থাকবেন, এটাই সবচেয়ে বড় আশঙ্কা। লেবাননে যুদ্ধবিরতি ইরান-আমেরিকা শান্তিচুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও ইসরাইল এখনো লেবাননে আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানও এর পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে রেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং বিশ্ব সম্প্রদায়কে লেবানন ও গাজায় পূর্ণ যুদ্ধবিরতি ও পুনর্বাসন উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল তার প্রতিফলন এখনো দেখা যাচ্ছে না। এভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিচুক্তির প্রতি মানুষের অনাস্থা তৈরি হয়। ইসরাইলের প্ররোচণায় ইরানের সাথে সমঝোতা ও শান্তিচুক্তি লঙ্ঘিত হলে শুধু ইসরাইলই নয় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা স্বার্থের উপর আবারো বড় আঘাত নেমে আসতে পারে। শান্তিচুক্তির পর বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় যে নতুন বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, তা রক্ষার দায়িত্ব সকল পক্ষের। খসড়া চুক্তি অনুসারে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি প্রতিষ্ঠায় যে আলোচনা ও মিডিয়েশন কার্যক্রম চলবে, বিশ্ববাসী তাতে সব পক্ষের সদিচ্ছার প্রতিফলন দেখতে চায়। ইরান যুদ্ধের মত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউরোপীয় দেশগুলোকে ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সফল হওয়ায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে অভিনন্দন। ইসরাইল-আমেরিকান হামলায় ইরানের সব ক্ষতি হয়তো পূরণ করা সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের অঙ্গীকার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
 

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট