সম্পাদকীয়

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রুখতে হবে

নিরাপত্তার প্রয়োজনে প্রাগৈতিহাসিক মানুষ সমাজ গঠন করেছিল। এখনো সামাজিক নিরাপত্তা আধুনিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য শর্ত। জ্ঞান-বিজ্ঞানের হাত ধরে মানুষ ক্রমবর্ধমান হারে সমৃদ্ধি ও প্রগতিশীলতা অর্জন করলেও দু:খজনকভাবে বলতে হচ্ছে, সামাজিকভাবে সাম্য ও নিরাপত্তা অর্জন করতে পারেনি। বিশেষত: নারীর সম্ভ্রম, মর্যাদা ও শ্লীলতা রক্ষায় আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। মূলত পরিবারই হচ্ছে একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি। সমাজ ও রাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা বৈষম্য, নৃশংসতা ও অবিচার পরিবার থেকেই শুরু হয়। আর সামাজিক পরিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সূচনা রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার অবক্ষয় থেকে। সেই সাথে তথ্য প্রযুক্তির বিশ্বায়নের হাত ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তির বাঁধাহীন, বল্গাহীন উপস্থিতি সেই অবক্ষয়ের সীমানাকে আরো অবারিত করে তুলেছে। এ থেকে উত্তরণের পথ বের করে নতুন প্রজন্মকে পারিবারিক-সামাজিক মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা এবং পাস্পরিক সম্প্রীতি ও মানবিক মর্যাদাবোধে উদ্বুদ্ধ করে তুলতে না পারলে আমাদের প্রযুক্তিগত, সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা ও ফলাফল মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। বিশেষত নারী ও শিশুদের প্রতি উন্মত্ত হিংস্রতা ও নৃশংসতা বন্ধের পাশাপাশি সমাজে দুর্বলদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে উন্নয়নের কোনো মানদন্ডই ধোপে টিকবে না।

নারী-শিশুদের ওপর পুরুষের প্রভাব ও জুলুম-বৈষম্য কোনো নতুন বিষয় নয়। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের মত ৯০ভাগ মুসলমান জনগোষ্ঠির দেশে নারী ও শিশুদের উপর নিগ্রহ,হিংস্রতা ও নৃশংসতা বেড়ে যাওয়ার যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তা খুবই অস্বাভাবিক-অমার্জনীয় ও উদ্বেগজনক। গতকাল একাধিক সহযোগী দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশে নারী ও শিশুদের ওপর নির্মমতা ও সহিংসতার এক ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে এসেছে। দেশে মানবাধিকার ও অপরাধ নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা এ সম্পর্কে যে সব তথ্য-উপাত্ত, পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন তা যে কোনো বিবেকবান, সমাজসচেতন মানুষকে উদ্বিঘ্ন ও উৎকণ্ঠিত করবে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল চারমাসে দেশে ১১৫শিশু হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে। এ সময়ে ১৮০ নারী ধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষিতদের মধ্যে ১৭জন হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে। এ সময়ে ১২ বছরের কম বয়েসী অন্তত ৫৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনাকে কোনো বিশেষণে বিশেষায়িত করা যাচ্ছে না। শিশুরা ফুলের মত। ১০-১২ বছর বয়েসী শিশুরা যে সমাজে নিরাপদ নয়, সে সমাজকে কোনো সভ্য সমাজ বলা যায়না। এ ধরণের নিরাপত্তাহীনতা ও পাশবিক বর্বরতা থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে মুক্ত করার আশু পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। নারী ও শিশুর প্রতি চলমান এই নিপীড়ন, সহিংসতা ও নৃশংসতা আমাদের সমাজের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সমাজতাত্ত্বিকদের কেউ কেউ একে একটি সাংস্কৃতিক ও কাঠামোগত সংকট হিসেবে দেখছেন। রাষ্ট্রীয় সীমাবদ্ধতা ও নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসণের মধ্য দিয়ে একবিংশ শতকের শুরুতে সমাজমানসে যে অবক্ষয় শুরু হয়েছিল, আজকের তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সব শ্রেণীর মানুষের অবাধ প্রবেশাধিকার ও বাছ-বিচারহীন বিচরণ একশ্রেণীর মানুষকে নারী ও শিশুদের প্রতি নির্মম-নৃশংস করে তুলেছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া বা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে অপরাধ প্রবণতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। তবে ঘরে ঘরে প্রতি হাতে থাকা স্মার্টফোনের প্রভাব শুধু আইন দিয়ে রোধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পরিবারের পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও মুরুব্বিদের দায়িত্বশীল আচরণ। বিনোদন ছাড়াও অনলাইন স্কুলিং-কোচিংয়ের নামে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে স্কুলগামী শিশুদের অনলাইনের প্রতি নির্ভরশীল ও আসক্ত করে তোলার বিপজ্জনক প্রবণতা সম্পর্কে রাষ্ট্রের ও সমাজের সচেতন প্রতিক্রিয়া ও কর্মপন্থা ঠিক করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিগত দুই দশকে অপরিনামদর্শী নিরীক্ষাধর্মী শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা ও চিরায়ত সামাজিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রে দু:শাসন, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি সামাজিক মূল্যবোধকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দিয়েছে। এ থেকে উত্তরণে কার্যকর উদ্যোগ আবশ্যক। সেই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার সুচিন্তিত উন্নয়ন ও রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। শুধু আইন বা নারীবাদী তত্ত্ব দিয়ে এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। সবক্ষেত্রেই আইনের শাসন জরুরি। শিশু ও নারী ধর্ষণের ঘটনাগুলোর স্বচ্ছ ও ত্বরিৎ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও শিক্ষার সংকট যেমন রাতারাতি ঘটেনি, এ থেকে উত্তরণও রাতারাতি হবে না। তবে নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে অবক্ষয়, অশ্লীলতা, অপরাধ প্রবণতা রোধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট