জিলহজ্জ মাসের ফাজাইল-মাসাইল ও আমাল
মোহাম্মাদ মাকছুদ উল্লাহ
জিলহজ্জ মাসটি হিজরি বর্ষপঞ্জির শেষ মাস হলেও ফযীলত ও গুরুত্ব বিবেচনায় মাসটি অন্যান্য মাসের তুলনায় অধিক মর্যাদাপূর্ণ। ইসলামের অন্যতম বুনিয়াদি বিধান হজ্জ’ এ মাসেই পালিত হয়। কুরআন ও হাদীসে জিলহজ্জ মাসের ফযীলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক বর্ণনা এসেছে। মাসটির প্রথম দশ দিন মহান আল্লাহর নিকট অত্যন্ত প্রিয় ও বরকতময়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেছেন,“শপথ ফজরের এবং দশ রাতের।”(সূরা আল-ফাজ্র: ১-২) অধিকাংশ মুফাস্সিরের মতে আলোচ্য আয়াতে দশ রাত বলতে জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ রাতকে বোঝানো হয়েছে। সে মতে জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের নেক আমলের ফযীলত অন্যান্য সময়ের আমলের তুলনায় বহুগুণ বেশি। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন,“এই দশ দিনের (জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের) নেক আমল অপেক্ষা মহান আল্লাহর নিকট অধীক প্রিয় অন্য কোনো দিনের নেক আমল নেই। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়? নবী করীম (সা.) উত্তরে বললেন, ‘জিহাদও নয়; তবে ঐ ব্যক্তি ব্যতীত, যে নিজের জীবন ও সম্পদ নিয়ে বের হলো কিন্তু কোনো কিছু নিয়েই ফিরে এলো না।”(সহীহ আল-বুখারী: ৯৬৯, জামে আত-তিরমিযী: ৭৫৭, সুনানে আবু দাউদ: ২৪৩৮) আলোচ্য হাদীস দ্বারা প্রমানিত হয় যে, জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের নেক আমল দ্বারা মুমিন বান্দা মহান রবের অধিতর নৈকট্ট অর্জন করতে পারে, যা অন্য সময়ের আমল দ্বারা অর্জন করা সম্ভব নয়।
জিলহজ্জ মাসের শ্রেষ্ঠ আমল হলো বাইতুল্লাহ শরীফের হজ্জ আদায় করা। এটি ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম এবং সামর্থবান মুসলমান নর ও নারীর উপর জীবনে একবার হজ্জ আদায় করা ফরজ। হজ্জের প্রত্যেকটি রুকন ও আমলের মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য ও আত্মাতিক শিক্ষা। হজ্জের মাধ্যমে মুমিনের জীবনের গুনাহ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ক্ষমা করে দেন। জিলহজ্জ মাসের ৯ম দিনটি ইআওমুল আরাফাহ নামে মুসলিম সমাজে বিশেষভাবে পরিচিত। এ দিনে রোযা রাখা অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ আমল। হযরত আবু কাতাদাহ আল-আনসারী (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ইআওমুল আরাফা’তে রোযা রাখার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, “এটি বিগত এক বছর ও আগামী এক বছরের গুনাহের জন্য কাফ্ফারা হয়ে যায়।”(সহীহ মুসলিম: ১১৬২, জামে আত-তিরমিযী: ৭৪৯, সুনানে ইবনে মাযা: ১৭৩০) যারা হজ্জে যাওয়ার সামর্থ রাখেন না তাদের জন্য জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের আমল বিশেষ করে আরাফার দিনের রোযা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দ্র. আমলের দ্বারা গুনাহ মাফ হওয়ার কথা বিভিন্ন হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। এটা শুধু সগীরা গুনাহের বিষয়ে প্রযোজ্য বলে মুহাক্কিক আলীমগণের অভিমত। কবীরা গুনাহের জন্য অবশ্যই তওবা করতে হবে। ১০ জিলহজ্জ হলো মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ জাতীয় উৎসব ‘ঈদুল আযহা’র দিন। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর আত্মত্যাগের মহান স্মৃতি স্মরণে সামর্থবান মুসলমানগণ এদিনে কুরবানী করেন। বস্তুত কুরবানীর মাধ্যমে মহান রবের নির্দেশ পালনে ব্যক্তি জীবনের সমস্ত কামনা-বাসনাকে উৎর্গ করার এক মহৎ স্মৃতির অনুশীলন করা হয়। মুমিন-মুসলমানের হৃদয়ে যেনো সদা সর্বদা নিজের জীবনের সকল আশা-আকাঙ্খার উর্ধে মহান আল্লাহর নির্দেশ পালনের সদিচ্ছাটা শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পায়, এটাই কুরবনীর আসল শিক্ষা। মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন,“তোমাদের কুরবানীর রক্ত-মাংশ কিছুই আল্লাহর দরবারে পৌঁছায় না। তাঁর নিকট পৌঁছে শুধু তোমাদের হৃদয়ের তাকওয়াটুকু।”(সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭) জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল রয়েছে। যেমন নফল নামায আদায় করা, নফল রোজা রাখা, কুরআন তেলাওয়াত করা, যিকির-আসগার করা, দান-সাদাকাহ করা ঈত্যাদি। বিশেষ করে তাকবীরে তাশরীক “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হাম্দ” এই তাকবীর বেশি বেশি পাঠ করা।
জিলহজ্জ মসের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পরে কমপক্ষে একবার তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা ওয়াজিব।(দুররুল মুখতার: ২/১৭৮, বাদাইউস সানাইয়: ১/২৭৫) মহান আল্লাহ এরশাদ করেছে,“তোমরা নির্দিষ্ট কয়েকদিনে আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো।”(সূরা আল-বাক্বারাহ: ২০৩) মুফাসসিরগণের অভিমত হলো, আয়াতে নির্দিষ্ট দিন বলতে উল্লেখিত দিনগুলিকে বোঝানো হয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণীত হয়েছে, তিনি ইআওমুল আরাফা (৯ জিলহজ্জ) থেকে ১৩ জিলহজ্জ পর্যন্ত তাকবীরে তাশরীক পাঠ করতেন। (মুসনাদে ইবনে আবী শাইবাহ: ৫৬৫১) আর যারা কুরবানী করবেন তাদের জন্য একটি বিশেষ আমল হলো, জিলহজ্জ মাসের চাঁদ উদীত হবার পর থেকে কুরবানী যবাই করার আগ পর্যন্ত নখ, চুল তথা শরীরের কোন অবাঞ্চিত অংঙ্গ কর্তন না করা। হযরত উম্মে সালমা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,“তোমাদের কেউ যখন কুরবানী করার ইচ্ছা করবে, তখন সে যেনো জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশক আরম্ভ হবার পর থেকে কুরবানী না করা পর্যন্ত তার চুল ও শরীরের কোনো অংশ কর্তন না করে।(সহীহ মুসলিম: ১৯৭৭) সমার্থক বর্ণনা এসেছে সুনানে নাসাঈ: ৪৩৬২ ও সুনানে আবী দাউদ: ২৭৯১ নং হাদীসে। মহান আল্লাহ সকলকে সহীহ সুন্নাহর উপর আমল করার তাওফীক দান করুন! লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ।
