সম্পাদকীয়

ওষুধ রফতানির বিপুল সম্ভাবনা

বাংলাদেশসহ ২০ দেশের বিশেষ কিছু ওষুধকে শতভাগ শুল্কমুক্ত ঘোষণা করেছে মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রধান ওষুধ আমদানিকারক দেশ। দেশটি বছরে ২১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ওষুধ আমদানি করে থাকে। বাংলাদেশসহ মাত্র অল্প কিছুসংখ্যক দেশ থেকে তারা বেশিরভাগ ওষুধ আমদানি করে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ওষুধ রফতানির ভলিউম তৈরী পোশাক শিল্পের সাথে তুলনীয় না হলেও এ শিল্পের বাণিজ্য সম্ভাবনা বিশাল। যেখানে বাংলাদেশের রফতানি আয়ের প্রায় ৮৫ ভাগই দখল করে আছে তৈরী পোশাক খাত, সেখানে এই তৈরী পোশাক রফতানি বাজারের প্রায় ৯০ শতাংশই শুধুমাত্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ওষুধ রফতানিতে বাংলাদেশের বাজার বিশ্বের শতাধিক দেশে বিস্তৃত। গত ৬-৭ বছরে বাংলাদেশের ওষুধ রফতানি দ্বিগুণ হলেও তা এখনো অর্ধ বিলিয়ন ডলারেও পৌঁছতে পারেনি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ২১৩ মিলিয়ন ডলারের ওষুধ রফতানি হয়েছে। তবে টাকার অংকটি খুব বড় না হলেও বাংলাদেশ বিশ্বের মোট ১৬৬টি দেশে ওষুধ রফতানি করেছে, এটি খুবই সম্ভাবনাময় ও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র তার পোশাক আমদানির ১০-১১ শতাংশ বাংলাদেশ থেকে নিয়ে থাকে ২০২৫ সালে এর পরিমাণ ছিল ৮.২ বিলিয়ন ডলার। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ আমদানির ১০ শতাংশ বাংলাদেশ থেকে রফতানির সুযোগ তৈরি হলে তা ২১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। ১৬৬টি দেশে ওষুধ রফতানির অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প দেশের এক নম্বর বাণিজ্যিক খাত হয়ে উঠতে পারে। দেশের রফতানি বাণিজ্য কয়েকটি নির্দিষ্ট পণ্য ও দু’-তিনটি প্রধান বাজারের উপর নির্ভরশীলতা খুবই বিপজ্জনক। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান বাস্তবতায় তা আবারো প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা বরাবরই রফতানি বহুমুখীকরণের উপর গুরুত্বারোপ করে আসছেন। শুধুমাত্র দুটি বাজারে তৈরী পোশাক রফতানির উপর নির্ভরশীল অর্থনীতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে ওষুধ রফতানির বিস্তৃত বাজারকে কাজে লাগানোর সুযোগ হাতছানি দিচ্ছে। প্রথাগত প্রচলিত পণ্যের বাইরে বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পণ্য ও সেবা খাতের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ, শক্তিশালী ও অনিবার্য হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন ও সচেষ্ট রয়েছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সম্মেলন উপলক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী নীতি নির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ-সিলিকন ভ্যালি প্রযুক্তি সংলাপে’ অংশগ্রহণ এ ক্ষেত্রে এক নতুন বার্তা বহন করছে। সিলিকন ভ্যালির বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সাথে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের প্রযুক্তিগত আদান-প্রদান ও মেধা বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ নতুন সম্ভাবনার দুয়ারে পৌঁছাতে পারে। বিশেষত এআই প্রযুক্তির মেধাসম্পদ গড়ে তুলতে সিলিকন ভ্যালির সহযোগিতার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। বাংলাদেশ বিশ্বের প্রধান বাজারগুলোতে যে হারে অদক্ষ শ্রমশক্তি রফতানি করছে, তার অর্ধেকও যদি দক্ষ ও মেধাবী উচ্চমানের জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশে-বিদেশের শিল্প খাতে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা আরো অনেক আগেই সম্ভব ছিল। পাট, চামড়া, চা’য়ের মতো পুরনো রফতানি পণ্যের সাথে যুক্ত হওয়া তৈরী পোশাক, ওষুধ, জাহাজ শিল্প আমাদের রফতানি বাণিজ্য ও অর্থনীতির চাকাকে সচল ও মজবুত করেছে। এবার ওষুধ শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে নতুন কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। দেশে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সাথে সাথে মেধা ও অর্থপাচার রোধ করে পরিকল্পিতভাবে তা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
 

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট