দু’উপজেলার হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগ চরমে দুর্গাপুর-মোহনপুর উপজেলার সংযোগস্থলে বারনই নদীর ওপর নির্মাণ হয়নি স্থায়ী সেতু
শামস সবুজ, দুর্গাপুর
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও দুর্গাপুর ও মোহনপুর উপজেলার সংযোগস্থলে বারনই নদীর ওপর নির্মাণ হয়নি স্থায়ী সেতু। ফলে দুই উপজেলার হাজারো মানুষকে এখনো নৌকায় নদী পার হয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে সেতুর প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে বারনই নদীতে পানি বাড়লে দুর্ভোগ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তখন নৌকাই হয়ে ওঠে দুই পাড়ের মানুষের একমাত্র ভরসা। জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন নদী পার হওয়া কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও রোগীদেরও ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় যাতায়াত করতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোই বাড়ছে, পাশাপাশি দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্গাপুরের কালীগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার মানুষকে মোহনপুরের বিভিন্ন বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বারনই নদী পার হতে হয়। একইভাবে মোহনপুরের মানুষও দুর্গাপুরের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করেন। কিন্তু সেতু না থাকায় সরাসরি সড়ক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে নদীর দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগ অনেকটাই নৌকাকেন্দ্রিক।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বারনই নদীর ওপর সেতু নির্মাণের দাবি উঠেছে। রাজনৈতিক নেতারাও নির্বাচনের আগে একাধিকবার সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথাও শুনেছেন তারা। কিন্তু প্রতিশ্রুতির বাইরে দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি।
দুর্গাপুর উপজেলার কালীগঞ্জের বাসিন্দা মো. শামিম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা শুনে শুনে বুড়ো হয়েছি। কতবার জরিপ হয়েছে, কত দল এসেছে, দেখে গেছে। কিন্তু সেতুর কাজ এক ইঞ্চিও এগোয়নি। আমাদের ছেলে-মেয়েরা বড় হয়েছে, তারাও এখন একইভাবে নৌকায় নদী পার হচ্ছে।’
বর্ষাকালে দুর্ভোগের মাত্রা সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করে মোহনপুরের ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বর্ষায় নদী ফুলে ওঠে। তখন পণ্য আনা-নেওয়া অনেক সমস্যার হয়ে যায়। এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে অনেক সময় লাগে। নৌকা পাওয়া না গেলে অপেক্ষা করতে হয়। এতে ব্যবসার সময় নষ্ট হয়, খরচও বেড়ে যায়।’
স্থানীয়রা জানান, বারনই নদীর ওপর সেতু না থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয় তাদের। কিন্তু নদীর পানি বাড়লে নৌকা পারাপারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা স্রোত বেশি থাকলে অভিভাবকরাও সন্তানদের নদী পারাপার নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। কৃষকদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। এলাকার কৃষিপণ্য নদীর ওপারের বাজারে নিতে হলে নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ে এবং সময় বেশি লাগে। পচনশীল পণ্য সময়মতো বাজারে নিতে না পারলে ক্ষতির মুখে পড়তে হয় কৃষকদের। স্থানীয়দের মতে, সেতু নির্মাণ হলে দুই উপজেলার কৃষি ও ব্যবসায়িক অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও ভোগান্তি কম নয়। জরুরি প্রয়োজনে রোগীকে এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় কিংবা রাজশাহী শহরের দিকে নিতে হলে নদী পারাপার একটি বাড়তি ঝুঁকি ও সময়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে রাতের বেলায় কিংবা বর্ষায় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় এই সমস্যা আরও প্রকট হয়।
স্থানীয়দের দাবি, বারনই নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হলে শুধু দুই উপজেলার মানুষের যাতায়াত সহজ হবে না, পুরো এলাকার আর্থসামাজিক চিত্রও বদলে যাবে। কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করা, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, শিক্ষার্থীদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত এবং চিকিৎসাসেবা গ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই সুফল মিলবে। পাশাপাশি দুই উপজেলার মধ্যে সড়ক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে।
এ বিষয়ে মোহনপুর উপজেলা প্রকৌশলী সাইদুর রহমান বলেন, ‘বারানই নদীর ওপর সেতু নির্মাণের একটি প্রস্তাবনা ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তবে বিভিন্ন সংকটের কারণে প্রকল্পটি এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।’ দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ফারজানা হাবিবা বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত হলাম। নদীর ওপর সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে খুব দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তবে সরকারি এই আশ্বাসে পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছেন না স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, অতীতেও একাধিকবার সেতু নির্মাণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনো কারণে সেই উদ্যোগ থেমে গেছে। ফলে নতুন করে দেওয়া আশ্বাসও বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে তাদের।
