সম্পাদকীয়

অনুকূল পরিবেশ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাবেন না

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের গণমাধ্যমগুলোতে কয়েক সপ্তাহ ধরে লেখালেখি হচ্ছে। কিন্তু কোনো দেশের কোনো গণমাধ্যমই সুনির্দিষ্ট সূত্রের বরাতে জানাতে পারেনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতে যাচ্ছেন অথবা যাচ্ছেন না। অবশেষে এ ব্যাপারে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি না হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে যাবেন না। অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির পূর্বশর্ত হিসেবে পররাষ্ট্রমনন্ত্রণালয়ের তরফে তার সচিব এ কে এম শহীদুল করিম বলেছেন, দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবর্তন চুক্তি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীর দ্রুত ফেরত পাঠানোর পাশাপাশি জুলাই বিপ্লবী শহীদ ওসমান হাদির অভিযুক্ত খুনিদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। বাংলাদেশের এই বক্তব্য অতি সহজ, ঋজু, দ্ব্যর্থহীন এবং যৌক্তিক। শহীদুল করিম প্রসঙ্গ উল্লেখ করে কীভাবে ভারতের পক্ষ থেকে পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছে তার বর্ণনা দিয়েছেন। বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারতে একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের সম্ভাবনা নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনা গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে যেভাবে প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন, তাতে এই প্রক্রিয়ায় অনুকূল পরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে, যা আমরা পরিষ্কার করে বলেছি। উল্লেখ করা যেতে পারে, দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করবেন, এমন তথ্য চাউর হওয়ার পর বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারকে অনুরোধ করা হয়, শেখ হাসিনাকে যেন এমন কর্ম থেকে ভারত সরকার নিবৃত্ত করে। দুঃখজনক হলো, বাংলাদেশের অনুরোধে পাত্তা দেয়ার গরজ দেখায়নি ভারত এবং যথারীতি শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছেন। এরপর অত্যন্ত সংগতকারণেই বাংলাদেশ এ ব্যাপারে একটি কঠোর বিবৃতি দিয়েছে, যাতে বাংলাদেশের যথার্থ ক্ষোভ প্রকাশিত হয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ যে, পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এই তথাকথিত সংবাদ সম্মেলনে হাসিনা এবং তার অনুসারীরা বাংলাদেশ ও তার জনগণের বিরুদ্ধে বিষবাষ্প উদগীরণ করেছেন। বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, যেদিন বাংলাদেশের মানুষ জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করছে, সেদিন ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনার এই ইন্টারেকশন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত এবং জুলাই বিপ্লবের শাহীদদের প্রতি মারাত্মক অবমাননা। বলা বাহুল্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির পূর্বশর্তবিষয়ক বিবৃতি বর্ণিত বিবৃতির ধারবাহিকতা মাত্র। ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী। শুধু নিকটতমই নয়, তার সঙ্গে বাংলাদেশের সাড়ে চার হাজার কিলোমিটারের বেশি অভিন্ন সীমান্ত রয়েছে। উপমহাদেশের অন্তর্গত দুটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নানা ক্ষেত্রে সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। আদান-প্রদান ও ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। বাস্তবকারণেই বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। কিন্তু ভারত তার স্বার্থপর নীতি ও বিগ ব্রাদারসূলভ আচরণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে দাবিয়ে রাখতে চায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদার প্রতি তার কোনো শ্রদ্ধা নেই। বিগত ৫৫ বছরে বিভিন্নভাবে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। দু’দেশের মধ্যে বহু দ্বিপক্ষীয় ইস্যু আছে, যেগুলোর সমাধান হচ্ছে না ভারতের অনীহার কারণে। অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানি বণ্টনের কোনো সুরাহা হচ্ছে না। একটি মাত্র অর্থাৎ গঙ্গা-পদ্মার পানি বণ্টন চুক্তি আছে বটে, তবে ৩০ সালা এ চুক্তির মেয়াদ এ বছর ডিসেম্বরেই শেষ হয়ে যাবে। এ নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি ঝুলে আছে বছরের পর বছর; এখন তা অনিশ্চিতই বলা যায়। দু’দেশের মধ্যে পানি সমস্যা ছাড়াও সীমান্তে লাগাতার বাংলাদেশি হত্যা, চোরাচালান, বাণিজ্যে অসমতা ইত্যাদি সমস্যা রয়েছে। এগুলোর ন্যায়সঙ্গত সমাধান না হলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অগ্রগতি ও বিকাশ সম্ভব হতে পারে না। অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির যে পূর্বশর্তগুলো বাংলাদেশের পক্ষে দেয়া হয়েছে, তা প্রতিপালনের দায়িত্ব সর্বাংশে ভারতের। এছাড়া ভারতকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে, বিগ ব্রাদারসুলভ আচরণ পরিহার করতে হবে এবং সার্বভৌম সমতা ও সৎ প্রতিবেশীসুলভ নীতির মান্যতা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা আশা করি, এসব শর্ত পূরণের ব্যাপারে ভারত সদিচ্ছা ও যথাযথ আন্তরিকতার পরিচয় দেবে।
 
 

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট