যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ নয়, দেশের স্বার্থ দেখতে হবে
গত ২ জুন, মঙ্গলবার ‘জোরপূর্বক শ্রমে’ উৎপাদিত পণ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি কার্যালয় (ইউএসটিআর)। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্যে পূর্ণ বা আংশিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এ প্রস্তাবের কারণে বাংলাদেশকে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হতে পারে। এ নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) বলেছে, জোরপূর্বক শ্রমে পণ্য উৎপাদনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে, শুধু তা দিয়ে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে না। বরং তা আরো খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। শিশু শ্রম কমানোর উদ্যোগ ও কাজের পরিবেশ উন্নত করার পরিকল্পনার মাধ্যমে এ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো যেতে পারে। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থ আদায়ে বাংলাদেশের উপর একের পর এক বাহানা সৃষ্টি করে শুল্ক বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিচ্ছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের অতিরিক্ত শল্ক আরোপ, এ নিয়ে নানা দেন-দরবার এবং এ বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় নির্বাচনের তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে পার¯পরিক বাণিজ্যচুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) সই করা বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের জবরদস্তিমূলক আচরণ। অর্থনীতিবিদরা ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেই বলেছেন. এই বাণিজ্যচুক্তির কারণে বাংলাদেশ রাজস্ব হারাবে, বেশি দরে পণ্য কিনতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া অনুযায়ী নীতি ঠিক করতে হবে এবং বাধ্যতামূলকভাবে অসংখ্য শর্ত পালন করতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশকে ১৩১টি শর্ত মানতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে মানতে হবে ৬টি। এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বাড়বে, নিজের ভূরাজনৈতিক কৌশল অনুযায়ী, বাংলাদেশকে নীতি গ্রহণে বাধ্য করতে পারবে এবং এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে তেমন কোনো ছাড় দিতে হবে না। সব মিলিয়ে এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের লাভ অতি সামান্য, ক্ষতি বেশি। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রই বাংলাদেশের একমাত্র ভরসা নয় এবং বড় বিনিয়োগকারি দেশও নয়। এর অনেক বিকল্প রয়েছে। ইতোমধ্যে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী দেশে পরিণত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে শীর্ষে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো অন্যায় আবদার কিংবা খবরদারিমূলক আচরণও চীন করেনা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বড় উৎস। এসব দেশে বাজার সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ আনার অবারিত সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। বলা বাহুল্য, বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি ক্ষয়ীষ্ণু দেশে পরিণত হয়েছে। ইরানযুদ্ধে তার সুপার পাওয়ারের দুর্বলতা প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। নখদন্তহীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এখন সে যুদ্ধ থেকে বের হতে নানা পথ খুঁজছে। বিশ্বে তার ইমেজ সংকটও তৈরি হয়েছে। এখন তার প্রভাব ও অর্থনৈতিক শক্তি দেখানোর জন্য বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের উপর নানা বাহানায় শুল্ক আরোপ করার নীতি নিয়েছে। শক্তিশালী দেশগুলো তার এই নীতিকে থোড়াই কেয়ার করছে। অন্যদেশগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে আলাপ-আলোচনা করছে। বাংলাদেশকেও এ প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-ভীতির কাছে নতজানু হওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
