খাদ্য নিরাপত্তায় কঠোর বিধান ও সুষ্ঠু বাস্তবায়ন প্রয়োজন
দিন দিন দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে নিরাপদ খাদ্য। সর্বত্র ভেজাল ও দূষণের ছড়াছড়ি। প্রতিদিন যেসব খাবার আমরা গ্রহণ করি, এর বেশির ভাগই অনিরাপদ, অস্বাস্থ্যকর—জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। এমন বাস্তবতায় আগামী ১ নভেম্বর থেকে দেশের খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে নিয়ম-নীতি শুধু দাপ্তরিক পর্যায়ে থাকলে হয় না, এর সুফল নির্ভর করে মাঠ পর্যায়ে নজরদারি ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের ওপর। প্রকাশিত খবরে জানা যায়, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, খাদ্য ব্যবসায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ভোক্তার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত ১৬ জুলাই ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা ২০২৬’ সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। নতুন বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধন নিতে হবে। আর বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নিবন্ধনের আওতায় আসবে রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ, ক্যাটারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, প্যাকেটজাত খাবার উৎপাদনকারী, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধপণ্য প্রস্তুতকারী এবং নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য আমদানিকারক। এ ছাড়া রাস্তার পাশের পিঠা, পুরি ও পিঁয়াজুর দোকান, পাইকারি মুদি খাদ্য ব্যবসা, খাদ্য সংরক্ষণাগার ও কোল্ড স্টোরেজ এবং ভোজ্য তেল ও ভোজ্য লবণ উৎপাদনের মতো ব্যবসাও নিবন্ধনের আওতায় আসবে। স্বাস্থ্য সহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য, চিকিৎসাসংক্রান্ত বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক এবং নিউট্রাসিউটিক্যালজাতীয় পণ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, আমদানি ও বিপণনে লাইসেন্স নিতে হবে। এ ছাড়া প্রবিধানমালায় নির্ধারিত জৈব খাদ্য, জিনগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত বা সংশোধিত খাদ্য, কিরণ-সম্পাতকৃত খাদ্য, অভিনব খাদ্য এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ বা ফর্টিফায়েড খাদ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করতে হবে।
দেশে ভেজাল ও দূষিত খাদ্য যে ভয়াবহ মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে কঠোর বিধি-বিধানের বিকল্প নেই। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) এক গবেষণায় দেখা গেছে, সারা দেশ থেকে সংগৃহীত খাদ্য নমুনার ৫২ শতাংশই দূষিত। গবেষণায় বলা হয়েছে, ৮২টি খাদ্যপণ্য পরীক্ষায় গড়ে ৪০ শতাংশ খাদ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহনীয় মাত্রার চেয়ে তিন থেকে ২০ গুণ বেশি নিষিদ্ধ ডিডিটি ও অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৩৫ শতাংশ ফল ও ৫০ শতাংশ শাক-সবজির নমুনায় বিভিন্ন কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। চালের ১৩টি নমুনায় অতি মাত্রায় আর্সেনিক এবং পাঁচটিতে ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি ধরা পড়ে। হলুদ গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় সিসা ও অন্যান্য ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। লবণে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০ থেকে ৫০ গুণ বেশি সিসা পাওয়ার তথ্যও রয়েছে। অন্যদিকে ভেজালবিরোধী অভিযানে জরিমানাও করা হয়। কিন্তু বাস্তবতার ইতিবাচক পরিবর্তন নেই। এদিকে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, ‘রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আলাদা লাইসেন্স নিতে হচ্ছে। ট্রেড লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, বিএসটিআই ও ফায়ার লাইসেন্সসহ নানা ধরনের অনুমোদন নিতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আমরা আর কতগুলো লাইসেন্স করব? আমরা সরকারের কাছে রেস্তোরাঁ খাতকে একটি কর্তৃপক্ষের অধীনে আনার দাবি জানাচ্ছি।’ এসব দাবিও আমলে নেওয়া দরকার। একটি বিষয় লক্ষণীয়, দেশে আইনের কমতি নেই, তবে নেই যথাযথ প্রয়োগ। রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও। কাজেই নতুন বিধানের সুফল পেতে হলে প্রয়োজন মাঠ পর্যায়ে সুষ্ঠু বাস্তবায়ন। নিরাপদ খাদ্য পেতে চাইলে সাধারণ মানুষের সচেতন ভূমিকাও অপরিহার্য।
