সম্পাদকীয়

ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি : কৃষিতে বিপর্যয়ের শঙ্কা

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। এটা শুধু বাংলাদেশ বা এ অঞ্চলের সংকট বললে ভুল হবে, এটা এখন একটি বৈশ্বিক সংকট। মূলত ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে এই সংকট ঘনীভূত হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে দেশে প্রথমবারের মতো খাদ্য ও জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা দেখা দেয়। যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় বিকল্প রাস্তা খোলা ও মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে সংকট সামাল দেয়া সম্ভব হলেও এবারের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন হরমুজ প্রণালির নৌপথ বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির অনুঘটক হয়ে উঠেছে। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইরানের অগ্রাধিকার সুবিধাপ্রাপ্ত দেশগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়েছে। এমনিতেই সরকার পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নানা অজুহাতে যত্রতত্র পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে মুনাফা লুটে থাকে। হঠাৎ করে প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে দেশের মূল্যস্ফীতির খড়গ কোথায় দাঁড়াতে পারে তা এখন বাংলাদেশের বাজারে সর্বত্র দেখা যাচ্ছে। এ সপ্তাহে দেশীয় বাজারে ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেলের মূল্য প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে গ্রামীণ দরিদ্র ও প্রান্তিক পর্যায়ের গরিব মানুষের জীবনযাত্রায় দুর্বহ বোঝার উপর শাকের আঁটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক শাসনে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও অলিগার্ক শাসিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বদলে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা জোরদারের প্রত্যাশা অনেক বেশি। প্রতিবেশী দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক টানাপোড়েন ও অসহযোগিতার কারণে এই সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি। এহেন বাস্তবতায় দেশের কৃষি উৎপাদন, মৎস্য, পোল্ট্রি, ডেইরি ও গবাদিপশুর খামারগুলোকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আঠারো কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির চাহিদা পূরণের সক্ষমতা জাতির অনেক বড় অর্জন। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই সাফল্য অব্যাহত রাখতে হবে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে পড়া বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি ফেরাতে নতুন সরকারের কাছে যে প্রত্যাশা করা হয়েছিল জ্বালানি সংকটের কারণে তা এখন বাড়তি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাচার হয়ে যাওয়া হাজার হাজার কোটি ডলার ফিরিয়ে এনে দেশে বিনিয়োগ প্রত্যাশার বাস্তবায়ন দেখতে চায় দেশের মানুষ। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনাসমূহ কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ আন্তর্জাতিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলো প্রত্যাশিত ঋণের ক্ষেত্রে নতুনভাবে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। এটিও দেশের অর্থনীতি ও সামগ্রিক বাস্তবতার জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তবে আমাদের বৈশ্বিক মন্দা কখনোই আমাদের কৃষি উৎপাদনের উপর বড় ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি। যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক-আঞ্চলিক সংকট মোকাবেলায় আমাদের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির উপর জোর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ডিজেলের মূল্য, সার, বীজ, কীটনাশক ও বিদ্যুতের সংকট যেন কৃষিখাতকে আক্রান্ত করতে না পারে সেদিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে সারাবিশ্বেই কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে। প্রাকৃতিক কারণে ফসলহানি কিংবা খাদ্য সংকট দেখা দিলে বাড়তি মূল্য দিয়েও যথাসময়ে চাহিদা পূরণ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নাও হতে পারে। এ কারণেই দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের রূপরেখা নিশ্চিত করতে কৃষিখাতকে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব থেকে যথাসম্ভব মুক্ত রাখা জরুরি। প্রকৃত কৃষকদের জন্য ভর্তুকি মূল্যে ডিজেল, সার সরবরাহ নিশ্চিত করার সাথে সাথে কৃষক ও ভোক্তা পর্যায়ে কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
 

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট