গোমস্তাপুরে বেওয়ারিশ কুকুর আতঙ্কে উপজেলাবাসী

গোমস্তাপুর সংবাদদাতা

বেওয়ারিশ কুকুর হলো মালিকবিহীন বা রাস্তায় বসবাসকারী কুকুর। এইসব কুকুরের উপদ্রব ও আতঙ্ক বর্তমান সময়ে একটি বড় সমস্যা। এসব কুকুরের কামড় ও আঁচড়ে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদের আক্রমণে শিকার হচ্ছে মানুষসহ বিভিন্ন পশু ও প্রাণী। এ ছাড়াও কিছু কুকুর শরীরে ক্ষত ও পচনসহ বিভিন্ন রোগ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আক্রান্ত এসব কুকুরের শরীর থেকে ছড়াচ্ছে নানা ধরনের রোগ জীবাণু ও দুর্গন্ধ। অসুস্থ এসব কুকুরের বিচরণে এলাকায় মানুষের চলাফেরা কঠিন হয়ে পড়েছে। বেওয়ারিশ এসব কুকুর নিয়ন্ত্রণে সরকারি বা এলাকাভিত্তিক কোন উদ্যোগ নেই বললেই চলে। ফলে দিনে দিনে বেড়েই চলছে জলাতঙ্কসহ বিভিন্ন ধরনের রোগব্যধি। বর্তমানে বেওয়ারিশ কুকুরগুলোর আক্রমণ আর তাদের ঘেউ ঘেউ শব্দে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সড়ক ও হাটবাজারে দিন দিন এসব বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত বেড়ে যাচ্ছে। এর থেকে পরিত্রান পেতে চায় উপজেলাবাসী।

বিশেষ করে ফাঁকা রাস্তা, হাটবাজার এলাকায় এদের চলাচল আগের তুলনায় অনেকাংশে বেড়েছে। এদের উৎপাতের মধ্য দিয়ে পথচারীদের আতঙ্কে চলাচল করতে হয়। বর্তমান সময়ে দুশ্চিন্তার একমাত্র প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব মালিকবিহীন বেওয়ারিশ কুকুর। এক সময় দেখা যেত এসব কুকুরের উৎপাত বন্ধে পৌর কর্তৃপক্ষ কিংবা স্থানীয় প্রশাসন তাদের নিধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতো। কিন্তু ২০১২ সালে একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিলেও ২০১৪ সাল থেকে চূড়ান্তভাবে নির্বিচারে কুকুর নিধন একেবারে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু প্রাণী কল্যাণ আইনের অধীনে এদের জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া ও বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচি চলমান রয়েছে।

সমগ্র উপজেলার প্রধান প্রধান সড়ক সহ রহনপুর পৌর এলাকার অলিগলিতে এখন এক আতঙ্কের নাম বেওয়ারিশ কুকুর। দলবেঁধে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এসব কুকুর। সকাল কিংবা রাত সব সময়ই রাস্তার মোড়ে মোড়ে এদের অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক সময় পথচারীদের দেখলেই তেড়ে আসে এবং ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। উপজেলা ও পৌর এলাকার মধ্যে অব¯িহত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরকে সকাল থেকেই প্রাইভেট, কোচিং এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতে হয়। এসব শিশু শিক্ষার্থীদের বেওয়ারিশ ও পাগলা কুকুরের উৎপাতে ভীত সন্ত্রস্ত থাকতে হয়। এ জন্য অভিভাবকদের শিশু শিক্ষার্থীদের পাহারা দিতে হচ্ছে তা না হলে বেওয়ারিশ ও পাগলা কুকুরের হামলার শিকার হতে হয়। শুধু শিশুরা নয় বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষরাও কুকুরের হামলার শিকার হচ্ছে।

কুকুরের ভয়ে নির্জন সড়কে একা পথ চলতে ভয় পাচ্ছে পথচারীরা। বিশেষ করে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী এবং মসজিদের মুসল্লিরা ভোরে ও রাতে যাতায়াতের সময় সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে থাকেন। অপরদিকে গরু, ছাগল, হাঁস ও মুরগির বাচ্চারাও এদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেনা। দিন দিন এসব কুকুরের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও পথচারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। হাসপাতালেও বাড়ছে কুকুরে কামড়ানো রোগীর সংখ্যা। আক্রান্তদের বেশির ভাগই শিশু।

কুকুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এলাকাবাসীরা জানায়, রাস্তায় বের হলে আগে ছিনতাইকারীর আতঙ্ক থাকলেও বর্তমানে এ বেওয়ারিশ কুকুরের আতঙ্কে আতঙ্কিত রয়েছি আমরা। কেননা এরা বেশ হিংস্র প্রকৃতির। রাস্তায় একা একা চলাফেরা করা বেশ অসুবিধা হয়ে পড়েছে। বাচ্চাকে স্কুলে পাঠাতেও ভয় পাচ্ছি আমরা। প্রশাসনের এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত। আইনি নিষেধাজ্ঞা এবং পরিবেশগত কারণে এখন আর আগের মতো কুকুর নিধন করা যায় না। প্রাণিবিদ ও পরিবেশবাদীদের মতে, এই সব কুকুর আমাদের চারপাশের ময়লা-আবর্জনা আর ক্ষতিকর জীবজন্তু খেয়ে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে সহযোগিতা করে। তাই ঢালাওভাবে কুকুর মেরে ফেলা কোনো স্থায়ী বা মানবিক সমাধান নয়। সচেতন নাগরিক ও পরিবেশকর্মীদের মতে, এই সমস্যার একমাত্র বৈজ্ঞানিক সমাধান হলো গণ-ভ্যাক্সিনেশন এবং বন্ধ্যাত্বকরণ কর্মসূচি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত জুলাই মাস থেকে এ পর্যন্ত এই হাসপাতালে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে ৪৮২ জন চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। এদের মধ্যে বেশির ভাগই শিশু ও বয়স্ক। তবে কয়েক সপ্তাহ ধরে কুকুরে কামড়ানো আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানালেন তিনি। রেজিস্টার দেখে জানালেন, চলতি বছরের  জুলাই মাসে ১৯৪ জন, আগষ্ট মাসে ১১১ জন ও চলতি মাসের গত ২৭ দিনে ১৭৭ জনের মতো কুকুরের আক্রমণে শিকার এমন রোগীরা চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। তবে এখনো কারও জলাতঙ্ক হয়নি। আমাদের হাসপাতাল থেকে সব ধরনের টিকা ও ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে হাসপাতালে র‌্যাবিস্ ভ্যাকসিন মজুত আছে। এই বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকার সচেতন মহল।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও রহনপুর পৌর প্রশাসক জিল্লুর রহমান জানান, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ও আন্তর্জাতিক আইনে নিরীহ প্রাণীকে হত্যার বিষয়টি মানবিকতার পরিপন্থী হওয়ায় পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কয়েক বছর যাবত বেওয়ারিশ কুকুর নিধন একেবারে বন্ধ রয়েছে। যার ফলে কুকুরের বংশবিস্তার দিন দিন বেড়েই চলেছে। তবে জননিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট