সম্পাদকীয়

মানবতাবিরোধী অপরাধে ৭ আওয়ামী লীগারের মৃত্যুদণ্ড

চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যায় উস্কানির দায়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ সাত জনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় তিন সদস্য বিশিষ্ট্য ট্রাইব্যুনালের জনাকীর্ণ কক্ষে সাতজনের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবির। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছরের মাথায় ঘোষিত পুনগর্ঠিত এই ট্রাইব্যুনালের এটি দ্বিতীয় রায়। এর আগে গত বছরের নভেম্বরের মাঝামাঝি এই ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীয় শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের সাবেক আইজি চৌধুরী আব্দুল্লা আল মামুনকে সাজা দেয়া হয়। হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃদ্যুদণ্ড দেয়া হলেও রাজসাক্ষী হওয়ার কারণে আব্দুল্লাহ আল মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে আদালত। মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত শেখ হাসিনাসহ মঙ্গলবারের সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পলাতক রয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রদত্ত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম রায়ের মধ্য দিয়ে জুলাই গণহত্যা মামলার বিচার নিয়ে সংশয় কেটে গেলেও নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলে ট্রাইব্যুনালের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা যে শঙ্কা ছিল, ১৫ সেপ্টেম্বরের রায়ের মধ্য দিয়ে সে আশঙ্কা অনেকটাই দূরিভূত হলো। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর এই রায়ে যাদেরকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে, এরা প্রত্যেকেই শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে নিজেদেরকে আইন ও বিচারের ঊর্ধ্বে মনে করতেন। রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো, কেউই আইন বা বিচারের ঊর্ধ্বে নন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল শেখ হাসিনার দেড় দশকের দুঃশাসন, নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক প্রতিরোধী গণবিস্ফোরণ। ছাত্রদের প্রতিবাদ ঠেকাতে সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ সরকারের দলীয় বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও সশস্ত্র অবস্থায় রাজপথে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাদের হাতে চৌদ্দশ’র বেশি মানুষ শহীদ এবং প্রায় চল্লিশ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব, অন্ধত্ব ও আহত হয়ে এখন মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। একাত্তরে মীমাংসিত ইস্যুকে পুনরুজ্জীবিত করে বিতর্কিত ট্রাইব্যুনাল ও বিচার প্রক্রিয়ায় শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ দেশে যে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল, জুলাইয়ের গণহত্যার মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের সেই ট্রাইব্যুনালের হাতে নিজেদের বিচারের রাজদণ্ড তুলে দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এই ট্রাইব্যুনাল ইতিহাসের কোনো ঝাপসা স্মৃতি বা অপরাজনৈতিক ন্যারেটিভের বিচার করছে না, তারা একটি রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে গণহত্যার জ্বলন্ত, দগদগে ক্ষতচিহ্নকে বিচারের প্রলেপে প্রশমনের চেষ্টা করছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের মানুষ সর্বাগ্রে জুলাই গণহত্যার বিচার ও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন চেয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই সনদ ও জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ৭ মাসের মাথায় ট্রাইব্যুনালের রায়ে শেখ হাসিনার পর আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ওবায়দুল কাদেরের রায় দেখে দেশের মানুষ অনেকটাই আশ্বস্ত ও আশাবাদী। মানুষ বাংলাদেশে ভবিষ্যতে আর কোনো ফ্যাসিস্টের উত্থান দেখতে চায় না। এর যে কোনো আশঙ্কা চিরতরে বন্ধ করা জনগণের সরকার এবং বিরোধীদলের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট হঠাৎ করেই শুরু হয়নি। সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ণ, ব্যবসায়ী ও আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কদের মাধ্যমে দেশ থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার করে অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া ও আদালতের মাধ্যমে এসবেরও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে যে কোনো ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। হাজার হাজার মানুষকে হত্যার সাথে যারা জড়িত তাদের সবাইকে বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশে পলাতক অপরাধীরা এখনো দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট