সম্পাদকীয়

মব ভায়োলেন্স রহিত করতে হবে

মব ভায়োলেন্স আমাদের দেশে নতুন না হলেও অতীতে এর সংখ্যা অনুল্লেখযোগ্য ছিল। কালেভদ্রে এটা ঘটতে দেখা যেতো। সাম্প্রতিক কালে এর সংখ্যা এত বেড়েছে যে, উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। প্রতি মাসেই মব ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটছে ও বাড়ছে। মব সৃষ্টি করে কোথায় যে কারা কাকে হত্যা করবে, আহত করবে, তার ঠিক-ঠিকানা নেই। বিরোধ বা শত্রুতাবশত কেউ মব সৃষ্টি করে অন্যকে তার শিকারে পরিণত করতে পারে, এমন আশংকাও প্রবল। কাজেই, মব ভায়োলেন্স নিয়ে শংকিত ও বিচলিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক। যখন আইনের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যায়, আস্থা হ্রাস পায়, তখন মানুষের মধ্যে আইন হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা-আস্থা তখনই কমে, যখন আইনের কার্যকারিতা ও শাসন যথাযথভাবে প্রতিফলিত হতে দেখা যায় না। আমরা দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট শাসনের অন্ধকারকাল অতিক্রম করে এসেছি। তখন জোর যার মুল্লুক তার নীতি চালু ছিল। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয়ভাবে অপহরণ, গুম, খুন ইত্যাদি কোনো ব্যাপারই ছিল না। একটা ভয়ের সংস্কৃতি ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল দেশজুড়ে। কারো জান-মাল-ইজ্জতের ন্যূনতম নিরাপত্তা ছিল না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী শাসনের জগদ্দল পাথর অপসারিত হয়। ফ্যাসিস্ট হাসিনা দলবলসহ ভারতে পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা করেন। দেশের মানুষ অন্ধকার থেকে আলোয় প্রত্যাবর্তন করে। মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়ে আনন্দ উপভোগ করে। তখন ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে জনমনে ক্ষোভ-অসন্তোষ জমাটবাঁধা অবস্থায় ছিল। এ কারণে তাদের প্রতি ভায়োলেন্স বা সহিংসতা সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারতো। অথচ, তা যায়নি। অতঃপর মব ভায়োলেন্স এত বাড়ছে কেন, সেটাই প্রশ্ন। এতদিনে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এখন তো আইনশৃংখলা আরো স্বাভাবিক হবে। আইনের শাসন যে কোনো সময়ের চেয়ে অধিকতর দৃশ্যমান হবে। এই প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার মধ্যেই মব ভায়োলেন্স নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে হবে কেন? মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে গণপিটুনি দিয়ে মানুষ হত্যা ও আহত করা থেকে শুরু করে কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে ফেলার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এহেন নৃশংসতা ও বর্বরতার কোনো তুলনা হয় না। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন নামের একটি মানবাধিকার সংগঠন গেল মে মাসের মব ভায়োলেন্সের একটি চিত্র তুলে ধরেছে, যাতে বলা হয়েছে, মে মাসে ৩২ জন নিহত হয়েছে এবং ৭১ জন আহত হয়েছে। হতাহতের এ সংখ্যা ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এপ্রিলে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২১ জন, আহতের সংখ্যা ৩২ জন। সংগঠনটি বলেছে, হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি স্পষ্ট প্রমাণ করে, জনগণের মধ্যে আইন হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা ক্রমাগত বাড়ছে। মব ভায়োলেন্সের সঙ্গে প্রধানত আইন হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা দায়ী। তাই এই প্রবণতা সৃষ্টি ও বাড়ার কারণ নির্ণয় করতে হবে। বিচার যথাসময়ে না পাওয়া, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনের শাসনের প্রতি সংশয় মানুষকে আইন হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করে। বিষয়টি তাই ভালোভাবে অ্যাড্রেস করতে হবে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও মান্যতা আইনের শাসন নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত আছে। এই প্রবণতা সৃষ্টির পেছনে অন্যান্য কারণও থাকতে পারে। এ নিয়ে গবেষণা হতে পারে। সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী ও ধর্মবেত্তাবৃন্দ স্ব স্ব ক্ষেত্রে গবেষণা করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ করতে পারেন। সে অনুযায়ী সরকার পদক্ষেপ নিতে পারে। সামাজিকভাবে, প্রচার মাধ্যমের সহায়তায় এ সম্পর্কে ইতিবাচক প্রচারণা চালানো যেতে পারে। মব ভায়োলেন্স গুরুতর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যায় পরিণত হওয়ায় একে নিয়ন্ত্রণ ও রহিত করার বিকল্প নেই।
 

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট