ব্যবসা হারাচ্ছে সোনামসজিদ, রাজস্বও যাচ্ছে অন্য বন্দরে
জাহিদ হাসান মাহমুদ মিম্পা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ এখন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। চার বছর আগেও যে বন্দরে ফল, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, মসলা, মাছ, কসমেটিকস, ভুট্টা ও ভুসিসহ নানা পণ্যের খালাস নিয়ে কর্মচাঞ্চল্য ছিল, সেখানে বর্তমানে পাথর ছাড়া অন্য কোনো পণ্য আমদানি এক প্রকার বন্ধই হয়ে গেছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতা, অতিরিক্ত কড়াকড়ি, শুল্ক নির্ধারণ ও মূল্যায়নে বৈষম্য এবং দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে ব্যবসায়ীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন এই বন্দর থেকে। এর ফলে বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তলানিতে ঠেকেছে। শত শত শ্রমিক বেকার হয়ে ঋণগ্রস্ত ও অসহায় জীবনযাপন করছেন, আর সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।
সোনামসজিদ স্থলবন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি ও ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা যায়, বন্দরটি ঝিমিয়ে পড়ার পেছনে প্রধান অন্তরায় কাস্টমসের নীতি ও সুযোগ-সুবিধার চরম অভাব। আমদানিকারকদের মতে, বন্দর পরিচালনা ও রাজস্ব আদায়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় বা বৈঠক করা হয় না। অধিক রাজস্ব প্রদানকারী পণ্য ফল ও জিরাসহ বিভিন্ন মসলাজাতীয় পণ্যের শুল্কায়নে কর নির্ধারণ ও মূল্য নিরূপণ নিয়ে কাস্টমস জটিলতা তৈরি করছে। ফলে একই পণ্য অন্য বন্দরে সহজে খালাস হলেও সোনামসজিদে এসে ব্যবসায়ীরা চরম লোকসানের মুখে পড়ছেন। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ না পেয়ে আমদানিকারকরা এখন হিলি বা ভোমরার মতো বিকল্প বন্দরের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।
এ ছাড়া বন্দর সংলগ্ন নিজস্ব কাস্টমস হাউস না থাকা এই সংকটের বড় একটি কারণ। বর্তমানে কোনো প্রশাসনিক ও রাজস্ব সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হলে ব্যবসায়ীদের ছুটতে হয় রাজশাহীতে। অন্যদিকে সোনামসজিদের অনেক পরে বন্দর হিসেবে অনুমোদন পেয়েও ভোমরায় কাস্টমস হাউস স্থাপিত হওয়ায় সেখানে রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বন্দর সচল থাকে এবং দিন দিন আমদানি বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ সোনামসজিদে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতা নয়, বরং নজরদারি বেড়েছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, যারা সঠিক পন্থায় ও সঠিকভাবে ব্যবসা করতে চায়, তাদের ব্যবসা করতে কোনো সমস্যা নেই। বর্তমানে এই স্থলবন্দরে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ আছে। আমদানিকারক ও রিয়াদ ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মিজান বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দরে পাথর ছাড়া আর কোনো ব্যবসা হচ্ছে না। পানামার ভেতর খালি পড়ে থাকে, এখন আগের মতো সেরকম গাড়ি আসছে না। এখানে অনেক শ্রমিক কাজ করতো, গাড়ি না আসা বা না থাকার কারণে শ্রমিকরাও এখন বসে আছে। অনেকে ঋণগ্রস্ত, অসহায় অবস্থায় জীবন পার করছে। তাই সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, সরকার যেন আমাদের এই বন্দরটার দিকে তাকায়, একটু নজর দেয়। যাতে করে আমরা আবার আগের মতোই গতিশীল করতে পারি। সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। সরকার যদি চায়, তাহলে সম্ভাবনা আছে, এখানে কোনো কিছু বাধা নেই। সরকার যদি চেষ্টা করে, তাহলে এই বন্দর আবারও পুরোনো রূপ ফিরে পাবে।
মেসার্স তুহিন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী তুহিন আলম বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দরে আগের মতো ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নেই। আগে এই বন্দর দিয়ে ফল, মাছ, ভুসি, ভুট্টা, কসমেটিকস ও মসলাজাতীয় পণ্য আমদানি হতো। বর্তমানে সোনামসজিদ স্থলবন্দরে কোনো সুযোগ-সুবিধা না থাকা, আমদানিকারকদের সঙ্গে কাস্টমস হাউসের কোনো মিটিং না হওয়া এবং সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দেখভাল না করার কারণে বন্দরটি ঝিমিয়ে গেছে। আসলে আমাদের এখানে কাস্টমস হাউস নেই এবং ব্যবসায়ীরা সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ার কারণে অন্য বন্দরমুখী হয়ে যাচ্ছেন। আমরা এখানে সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ার কারণে হিলি বা ভোমরা বন্দরমুখী হয়ে যাচ্ছি। এর ফলে এই বন্দর রাজস্ব হারাচ্ছে।
তিনি বলেন, তাই আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি- আমাদের এখানে একটা কাস্টমস হাউসের দরকার। কারণ পোর্টকেন্দ্রিক কোনো সমস্যা হলে আমাদের রাজশাহী যাওয়া লাগে। কিন্তু দেখেন ভোমরা সোনামসজিদের অনেক পরে বন্দর হয়েছে, কিন্তু সেখানে কাস্টমস হাউস হয়ে যাওয়ার কারণে রাত ৮টা বা ১০টা পর্যন্ত তাদের পোর্ট খোলা থাকে। কাস্টমস হাউস থাকার কারণে তারা তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা বলতে পারে। যার কারণে সোনামসজিদ স্থলবন্দরের ব্যবসাগুলো অন্যান্য পোর্টে ভাগ হয়ে যাচ্ছে।
সোনামসজিদ স্থলবন্দরের আমদানি ও রপ্তানিকারক গ্রুপের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি স্থবির হয়ে আছে। গতি অনেক কমে গেছে। যার কারণে এখানে যেমন ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি শ্রমিক থেকে শুরু করে অনেকে এই বন্দরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই সরকারের কাছে দাবি জানাবো- এই বন্দরকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকার যেন এই বন্দরে সুযোগ-সুবিধা দেয়, যাতে সরকারের রেভিনিউ কালেকশন বেশি হয়। আমরা ব্যবসায়ীরা সরকারকে রেভিনিউ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। এ ছাড়া ফল, জিরাসহ মসলাজাতীয় পণ্য এই বন্দর দিয়ে আসা কমে গেছে। এই পণ্যগুলোতে রাজস্ব বেশি আদায় হয়, তাই এই বন্দর দিয়ে রাজস্ব আসাও কমে গেছে।
আরেক আমদানিকারক সাঈদ বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দরের বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ। পাথর ছাড়া অন্য আইটেম আসছে না। কারণ হচ্ছে- ট্যাক্সের ভ্যারিয়েন্ট হয়ে যাচ্ছে, ভ্যালু নির্ধারণের ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। এটা কাস্টমস ভালোভাবে দেখছে না। একজন আমদানিকারক যখন দেখবে ট্যাক্সের ভ্যারিয়েন্ট হয়ে যাচ্ছে, তখন অন্য জায়গায় সেল দিতে পারবে না। এ ছাড়াও এই বন্দরে রাজস্ব ঘাটতির প্রধান কারণ কাস্টমস। কাস্টমস যদি এ রকম ঝামেলা না করে, বরং অন্যান্য পোর্টের মতো সুযোগ-সুবিধা দেয়, তাহলে অন্যান্য পণ্য আমদানি বেড়ে যাবে। তাই এই বিষয়ে অবশ্যই সরকারকে নজর দেওয়া দরকার। কেন কাস্টমস এই কাজগুলো করছে, অন্য পোর্টগুলো যেভাবে চলছে এই পোর্ট সেইভাবে চলছে না কেন? এটা অবশ্যই তদন্ত করে দেখা দরকার।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দর রেভিনিউ কালেকশনের দিক দিয়ে বেনাপোলের পরে দ্বিতীয় স্থলবন্দর ছিল। ভৌগোলিক কারণ ও নেতৃত্বের কারণে সোনামসজিদ স্থলবন্দরের রেভিনিউ কমে যাচ্ছে। এটা ব্যর্থ হওয়ার দিকে যাচ্ছে। ব্যর্থ হওয়ার কারণ হচ্ছে সোনামসজিদ এলাকায় কাস্টমসের আবাসন ব্যবস্থা না থাকা। কাস্টমসের কর্মকর্তারা শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী থেকে যাওয়া-আসা করে। আমাদের আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পোর্ট চালু থাকবে। কিন্তু এখানে অফিসাররা আসে ৯টা, ১০টা বা ১১টার সময়, আবার ৪টার পরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয় রাস্তায় যাওয়ার নিরাপত্তাজনিত কারণে। তারা তাড়াতাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করে। এটি এক নম্বর সমস্যা।
সোনামসজিদ স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা রাজু মিয়া বলেন, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমাদের এখানে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৮১৯ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আদায় হয়েছিল ৯০৯ কোটি টাকা। ব্যবধান প্রায় ৯০ কোটি টাকা। শতকরা হিসেবে ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। রাজস্ব ঘাটতির অনেকগুলো কারণ এখানে কাজ করে। এই ক্ষেত্রে আমদানি কমে যাওয়া বা আমদানি শুল্ক কমে যাওয়াসহ নানা কারণে রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আগে এখানে বিভিন্ন ধরনের আইটেম আমদানি হতো। বিভিন্ন কারণে কিছু কিছু পণ্য আমদানি কমে গেছে, যার কারণে রাজস্ব ঘাটতি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতা সেটা বলা যাবে না। তবে হ্যাঁ নজরদারি বেড়েছে, সেটা ঠিক আছে। আমাদের কমিশনার মহোদয়ের নির্দেশনা হচ্ছে- সঠিকভাবে সঠিক পন্থায় যারা ব্যবসায়ী আছে তাদের ওয়েলকাম, তারা ব্যবসা করবে। ভিন্ন পন্থায় যারা ব্যবসা করতে চায়, তাদের এই সুযোগ এখানে কমে গেছে। যার কারণে বলতে পারেন, রেভিনিউতে ইম্প্যাক্ট পড়তে পারে। তবে বন্দরে এখন ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ আছে, সঠিকভাবে সঠিক পন্থায় ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারছে।
