বন্ধ গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরের চাবি এনবিআরের হাতে

ডালিম হোসেন শান্ত

নানা প্রত্যাশা আর সম্ভাবনা সামনে রেখে জমকালো আয়োজনে উদ্বোধন করা হয়েছিল রাজশাহী গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর। কিন্তু উদ্বোধনের এক বছরের মধ্যেই কর্মচাঞ্চল্য হারিয়ে এখন অনেকটাই নীরব বন্দরটি। যেন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেও আটকে গেছে তালা। ভারতের সঙ্গে নৌপথে বাণিজ্যের নতুন দ্বার খুলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ৫৯ বছর পর গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি চালু হয় সুলতানগঞ্জ নদীবন্দর। ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার মায়া বন্দরের সঙ্গে পুনঃস্থাপিত হয় পণ্য পরিবহণের সংযোগ। বর্তমানে বন্দরটি নিয়মিতভাবে চালুর বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে।

সুলতানগঞ্জ বন্দর থেকে মায়া বন্দরের দূরত্ব মাত্র ১৭ কিলোমিটার। উদ্বোধনের পর পরীক্ষামূলকভাবে এই নৌপথে পাঁচটি নৌযানে পাথর, কয়লা ও গার্মেন্টস ঝুট আমদানি-রফতানি হয়। কিন্তু কিছুদিন পরই নাব্যতা সংকটে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এখন এই সমস্যা এখন না থাকলেও সামনে আসে আরেক বাধা, বন্দর পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নিজস্ব অবকাঠামো। সেটিও এখন প্রস্তুত। কিন্তু নেই রাজস্ব বিভাগের জনবল।

সুলতানগঞ্জ-মায়া নৌপথ চালুর মধ্য দিয়ে রাজশাহী ও আশপাশের ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের একটি প্রত্যাশা পূরণ হয়েছিল। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতের সঙ্গে পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে এ রুটটি অন্য অনেক পথের তুলনায় সহজ ও সাশ্রয়ী। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি করা গেলে পরিবহণ ও ক্যারিং খরচ উল্লেযোগ্যভাবে কমবে। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহীসহ আশপাশের জেলার ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন। সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে পাথর আনতে এখানের তুলনায় প্রতি টনে ১০ ডলারেরও বেশি খরচ হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, সুলতানগঞ্জ বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি করা গেলে ক্যারিং খরচ প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমতে পারে। একই সঙ্গে ভারত থেকে আরও বিভিন্ন ধরনের পণ্য আনার সুযোগ তৈরি হবে।

পরীক্ষামূলক আমদানি-রফতানির চার মাস পরও বন্দর নিয়ে ইতিবাচক ছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান। গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর রাজস্ব বোর্ড, কাস্টমস ও বন্দর পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রতিনিধি সুলতানগঞ্জ বন্দর পরিদর্শন করেন। সেই পরিদর্শনে বন্দরের নিজস্ব অবকাঠামো তৈরির বিষয়টি সামনে আসে। পরে পণ্য পরিবহণের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা জানায় কাস্টমস। একপর্যায়ে আমদানি-রফতানির অনুমতি বন্ধ হয়ে যায়।

কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, রাজশাহীর কমিশনার মো: খায়রুল কবির মিয়া বলেন, আমার জানামতে এ বিষয়ে কিছুদিন আগে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার অফিসে একটা মিটিং হয়েছিল সেখানে কি সিদ্ধান্ত হয়েছে আমার জানা নেই। তবে আমাদের কাছে সুলতানগঞ্জ পোর্ট নিয়ে যেই গ্রাউন্ড ওয়ার্কের ফাইল ছিলো সেগুলো আমরা এনবিআর অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছি। এ বিষয়ে সেখান থেকে সিদ্ধান্ত জানা যাবে।

রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাসেন আলীর মতে, দেশের নিকটবর্তী বন্দরগুলোর মধ্যে সুলতানগঞ্জ অন্যতম। বন্দরটি এখনও কার্যকরভাবে চালু না হওয়ার পেছনে রাজস্ব বিভাগের সহযোগীতার ঘাটতি আছে। এই বন্দর দিয়ে আমরা পণ্য আমদানি করতে পারলে আমাদের ব্যায় কমবে। পাশাপাশি সেখানে কমপক্ষে দুই হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে। রাজস্ব কর্মকর্তাদের জন্য অবকাঠামোর শর্ত ছিলো সেটা পূরণ করা হলেও বন্দও চালু করার ব্যাপারে এখনো রাজস্ব বিভাগ থেকে কোনো সহযোগীতা পাচ্ছি না। মায়া বন্দর প্রস্তুত রয়েছে।

গেজেট অনুযায়ী, সুলতানগঞ্জ বন্দরে আসা মালবাহী লাইটার রাজশাহী নগরীর কাছাকাছি নদীপথে এসে ভিড়তে পারবে। ফলে নগরীর পাশের বহুমুখী সড়ক যোগাযোগ ব্যবহার করে আমদানি করা পণ্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় সহজে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হবে। এ কারণে ব্যবসায়ীদের কাছে সুলতানগঞ্জ শুধু একটি নদীবন্দর নয়; এটি রাজশাহী অঞ্চলের বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাব্য নতুন কেন্দ্র। বন্দরের নিজস্ব অবকাঠামো নিয়ে কাস্টমসের শর্তের বাধার মাঝেই থেমে আছে সুলতানগঞ্জের বাণিজ্যিক যাত্রা। সাজানো-গোছানো উদ্বোধনের পর যে বন্দরকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল নতুন বাণিজ্যপথের স্বপ্ন, সেই স্বপ্ন এখন আটকে আছে অনুমোদনের অপেক্ষায়। সুলতানগঞ্জের ঘাটে আবার কবে ভিড়বে পণ্যবাহী নৌযান এখন অনেকটাই নির্ভর করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর। সুলতানগঞ্জের বাণিজ্যিক দরজা খোলা, কিন্তু সেই দরজার চাবি আপাতত এনবিআরের হাতেই।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট