ভারতে জাহাজডুবির ঘটনায় বাংলাদেশি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার নিখোঁজ
ভারতের ওড়িশা উপকূলের কাছে বঙ্গোপসাগরে পানামার পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ ‘এমভি ওশান উইনার’ ডুবে গিয়ে মো. আবদুল্লাহ আল মামুন নামে বাংলাদেশি এক মেরিন ইঞ্জিনিয়ার নিখোঁজ হয়েছেন। জাহাজডুবির পর থেকে পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। ভারতীয় কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী নিখোঁজদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে।মামুন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শহরের গণমুখী মাঠসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা।ভারতীয় কোস্টগার্ড ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ আগস্ট বঙ্গোপসাগরে জাহাজটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। পরে জাহাজটি ডুবে যায়। এতে ২৪ জন ক্রু ছিলেন। তাদের মধ্যে ২০ জন চীনের, তিনজন মিয়ানমারের এবং একজন বাংলাদেশের নাগরিক। জাহাজডুবির পর এখন পর্যন্ত দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ২২ জনের সন্ধানে অভিযান চলছে।সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে মামুনের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের উৎকণ্ঠিত অবস্থায় দেখা যায়। পরিবারের সদস্যরা মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন এবং নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নতুন তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন।পরিবারের সদস্যরা জানান, মামুনের মা দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্রোগে ভুগছেন। ছেলের নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মামুনের স্ত্রী ও সন্তানরাও উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন।মামুনের বড় ভাই আব্দুল্লাহ আল বাকি বলেন, ‘আমরা খুব ভেঙে পড়েছি। আমার মা অসুস্থ। সরকারের কাছে আমাদের একটাই অনুরোধ, আমার ভাইয়ের বিষয়ে যত দ্রুত সম্ভব একটি নিশ্চিত খবর আমাদের জানানো হোক।’আব্দুল্লাহ আল বাকি জানান, মামুনের ডাকনাম মানিক। তিনি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে জাহাজে কর্মরত ছিলেন। প্রায় চার মাস সমুদ্রে দায়িত্ব পালনের পর ভারতের ওড়িশা থেকে সিঙ্গাপুরগামী ‘এমভি ওশান উইনার’ জাহাজে যোগ দেন তিনি।তিনি বলেন, ‘গত বুধবার আমার ভাইয়ের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়েছে। এরপর শুক্রবার জাহাজটি আকরিক নিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে রওনা হয়। পরে জাহাজটি দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার খবর পাই। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ করছি। তবে এখন পর্যন্ত মামুনের অবস্থান সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।’তিনি আরও বলেন, ভারতীয় কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে মামুনের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান জোরদার করার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করেছেন তারা।মামুনের বোন বলেন, ‘তিন দিন ধরে আমরা ভাইয়ার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারছি না। তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন, কিছুই জানি না। আমরা দ্রুত তার একটি খবর চাই।’মামুনের মেজো ভাই আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ‘আমরা আমার ভাইকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পেতে চাই। সরকারের কাছে আমরা সঠিক তথ্য চাই। আল্লাহ যেন তাকে সুস্থভাবে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেন।’মামুনের চাচাও উদ্ধার অভিযান জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, জাহাজডুবির খবর পাওয়ার পর থেকেই পরিবার ও স্বজনরা উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। জীবিত কোনো ক্রুর সন্ধান পাওয়া গেলে দ্রুত পরিবারকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।জাহাজটির ২৪ জন ক্রুর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশি ছিলেন মামুন। দুর্ঘটনার পর দুজনকে জীবিত উদ্ধারের খবর পাওয়া গেলেও তারা কেউ বাংলাদেশি নন। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া দুজনই চীনের নাগরিক।মামুনের বাল্যবন্ধু সাদাত আল কাবিজু তার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তিনি জানান, গত এপ্রিলের শেষ দিকে মামুন ‘এমভি ওশান উইনার’-এ যোগ দেন। ওড়িশা উপকূল থেকে জাহাজটি ছাড়ার রাতে মামুনের সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়। দুর্ঘটনার পর নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও এখন পর্যন্ত মামুনের বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ‘এমভি ওশান উইনার’ ওডিশার পারাদ্বীপ বন্দর থেকে লৌহ আকরিক নিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। জাহাজটি প্রায় ২২৫ মিটার দীর্ঘ। এতে প্রায় ৭২ হাজার ১০০ মেট্রিক টন লৌহ আকরিক ছিল।২২ আগস্ট বেলা ১১টা ৪৮ মিনিটের দিকে সামুদ্রিক উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্র জাহাজটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার তথ্য পায়। এরপর কাছাকাছি থাকা বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এমটি আইসোপোস’কে উদ্ধার অভিযানে যুক্ত করা হয়। পরে ভারতীয় কোস্টগার্ডের ‘বরদ’, ‘আনমোল’ ও ‘বিজিত’ জাহাজও অভিযানে নামে।রাতে লাইফ র্যাফট থেকে দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ভারতীয় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে আকাশ ও সমুদ্রপথে নিখোঁজদের সন্ধান চালাচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাকি ২২ জনের অবস্থান এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। জাহাজটি কী কারণে ডুবে গেছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি।মামুনের পরিবার জানিয়েছে, তারা সরকারের কাছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত উদ্ধার অভিযান জোরদার এবং নিখোঁজ মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের অবস্থান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। সূত্র: কালবেলা
