ভরা বর্ষায় পর্যাপ্ত পানি না থাকায় পাট জাগ দিতে পারছেন না রাজশাহীর চাষিরা
হাবিব আহমেদ
সোনালী আঁশ পাট নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন রাজশাহীর চাষিরা। জমি থেকে পাট কাটার পর জাগ দেয়ার মত পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পানি সংকটের কারণে দিনের পর দিন কাটা পাট জমিতেই পড়ে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। দু’একজন কৃষক ভাড়ায় জলাশয় নিয়ে পাট জাগ দিলেও বেশিরভাগ কৃষকই তা পারছেন না। এতে অনেক কৃষক পাটজাগ দেয়ার পানি বা ভাড়ায় জায়গা না পেয়ে জমি থেকে পাট কাটা বন্ধ করে দিয়েছেন। সনাতন পদ্ধতিতে পাট জাগ দেয়া ছাড়া উপায়ও খুঁজে পাচ্ছেন না চাষিরা। পানি সংকটের কারণে এবার বাজারে পাটের দাম ভাল হলেও খুশি হতে পারছেন না চাষিরা। তবে গত কয়েকদিন ভারি বৃষ্টি হওয়ায় কিছু কিছু এলাকার কৃষকরা পাট কাটা শুরু করেছেন।
জানা গেছে, রাজশাহীতে গত দেড় দশকে পাট চাষের জমি কমে প্রায় অর্ধেকে এসেছে। মূলত রাজশাহীর নিচু জমিতে পাট চাষ করা হয়। সেই নিচু জমি এখন আর রাজশাহীতে অনেক কম। যার কারণে এখন কিছু পাট চাষ করা হয় উঁচু জমিতে। সেই জমির পরিমাণও অনেক কম। বিগত দেড় দশক ধরে রাজশাহীর খালবিলে পুকুর খননের কারণে মূলত পাট চাষের জমি কমে গেছে। আগে বাণিজ্যিকভাবে পাট চাষ হলেও এখন আর সেভাবে চাষ হচ্ছে। নানান কারণে কিছু কিছু এলাকায় এই পাট সবজি হিসাবে চাষ করা হচ্ছে। বাড়ন্ত পাটের পাতা তুলে বাজারে সবজি হিসাবে বিক্রি করছেন কৃষকরা। এক সময় রাজশাহীর ৯টি উপজেলায় বিপুল পরিমাণ জমিতে পাট চাষ হতো। এখন কমে অর্ধেকে এসেছে। বর্তমান রাজশাহীর দুর্গাপুর, পুঠিয়া, পবা ও বাগমারায় পাট চাষ হয়। কিছু পাট চাষ হয় চরে। আর বাকি ৫টি উপজেলায় পাট চাষ হলেও সামান্য পরিমাণ হয়। এরমধ্যে মোহনপুর উপজেলার বেশিরভাগ কৃষকই পাট চাষ করে সবজি হিসাবে বিক্রি করেন। তানোর, গোদাগাড়ী, বাঘা, চারঘাটে পাট চাষ হয় সিমিত আকারে। কারণ হিসাবে দেখা গেছে, আগে পাটের দাম ছিল না। আর বর্তমান দাম থাকার পরও পাট কেটে জাগ দেয়ার মত পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায় না। যার কারণে কৃষকরা পাট চাষ কমিয়ে দিয়েছে।
রাজশাহীর দুর্গাপুরের পাট চাষি আশকোর আলী শাহ জানান, তিনি বছর দশেক আগে ৬ থেকে ৭ একর জমিতে পাট চাষ করতেন। বর্তমান তিনি পাট চাষ করেন তিন থেকে চার বিঘা জমিতে। তার পাটের বেশ কিছু জমিতে পুকুর খনন করা হয়েছে। অবশিষ্ট জমিতে পাট চাষ করলেও ভাল সুফল পান না তিনি। তিনি বলেন, আমার কিশমত গণকৈড় গ্রামের পশ্চিম পাশে বিশাল আকারের বিল ছিল। পাট কেটে সেখানে জাগ দেয়া হতো। কিন্তু এখন পুরো বিলে পুকুর খনন করা হয়েছে। বলা যায়, পাট জাগ দেয়ার পানি পাওয়াই যায় না। আমি নিজের পুকুরে পাট জাগ দেই। এতে পুকুরের মাছের অনেক ক্ষতি হয়। সব মিলিয়ে পাট জাগ দেয়ার পানির অভাবে চাষ কমিয়ে দিয়েছি। বাগমারার বেলাল হোসেন জানান, আমাদের বাগমারা সব চেয়ে বড় বিল হলো যশোর বিল। এই বিলে কৃষকরা পাট কেটে জাগ দিতো। কিন্তু এখানেও পুকুর খননের কারণে কৃষকরা পাট জাগ দিতে পারে না। তিনি বলেন, কিছু কিছু কৃষকরা পাট জাগ দেয়ার জন্য পুকুর বা জলাশয় ভাড়া নেন। কিন্তু সবার পক্ষে এটা সম্ভব হয় না। যার কারণে অনেকেই আর পাট চাষ করেন না। তিনি বলেন, এবার বৃষ্টি কম। যার কারণে জলাশয় পাওয়া যাচ্ছে না। এক বিঘা জমির পাট কেটে রেখেছি কিন্তু পানির অভাবে জাগ দিতে পারিনি। আবার জমিতে যে পাট রয়েছে সেগুলো পর্যাপ্ত পানি না পাওয়া পর্যন্ত কাটতেও পারছি না।
পুঠিয়ার শিলমাড়িয়া উনিয়নের কৃষক আফাজ আলী বলেন, পাট জাগ দেয়ার পানি না পাওয়ায় গত দশদিন ধরে কাটা পাট জমিতেই পড়ে আছে। খালবিলে পানি নেই। খালবিলে পানি প্রবেশের জায়গা নেই। বিলে পানি ঢোকার দুদিকের ব্রীজের মুখে রয়েছে পুকুর। যার কারণে আমরা পাট জাগ দেয়ার পানি পাচ্ছি না। এতে কাটা পাটও জমিতেই পড়ে থাকছে। তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছর পাটে লোকসান হয়েছে। এবার পাটের দাম ভাল, কিন্তু পাট সুষ্ঠুভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারে উঠাতে না পারলে ভাল দাম হয়ে লাভ কি। তিনি বলেন, এই অঞ্চলে জলাশয় ভাড়া পাওয়া যায় না। নির্ভর করতে হয় খালবিলের। কিন্তু আমাদের আশপাশের কোনো খালবিলে পাট জাগ দেয়ার মত পর্যাপ্ত পরিমান পানি নেই। দুরে পানি আছে, কিন্তু খরচ অনেক বেশি। তাই বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। এমন অনেক কৃষকই বলেন, পাট চাষিরা পানি সংকটের কারণে চরম বিপাকে পড়ে আছেন। কোনো কোনো কৃষক জমি থেকে পাট কেটে ফেলে রেখেছেন, আবার অনেক কৃষক পানির অপেক্ষায় পাট কাটা শুরু করতে পারছেন না। আর যাদের জাগ দেয়ার জায়গা আছে তারা পাট কেটে জাগ দিয়ে বা প্রক্রিয়াজাত করে বাজারে বিক্রি করছেন।
উল্লেখ্য, চলতি পাট মৌসুমে রাজশাহী জেলায় ৪৯ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর এর পরিমান ছিল ৪৮ হাজার ৬৭৭ মেট্রিক টন।
