আইন আর আবেগ একসঙ্গে চলবে না
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা কাম্য হলেও পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে বিচার বিভাগ চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করা হয়, প্রতিপক্ষ দমনে একে যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়। ফ্যাসিবাদী শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, বিচার বিভাগকে নিরঙ্কুশভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা। অপর একটি বৈশিষ্ট্য হলো, গণমাধ্যমকে সম্পূর্ণ কুটক্ষগত করা। এইসঙ্গে আরো একটি বৈশিষ্ট্য হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় বাহিনীতে পরিণত করা। ফ্যাসিস্ট শাসকের এই বৈশিষ্ট্য ছাড়াও আরো নানান বৈশিষ্ট্য আছে, যার বিস্তারিত উল্লেখ থেকে বিরত থাকছি। এই প্রধান তিনটি বৈশিষ্ট্যই যথেষ্ট। বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করে দেশে একটি ‘ভয়ের রাজত্ব’ প্রতিষ্ঠা করাই ফ্যাসিবাদীদের উদ্দেশ্য, যা তাদের মসনদ স্থায়ী ও নিরাপদ করা জন্য জরুরি। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন ইতিহাসের নিকৃষ্টতম শাসন হিসেবে বিবেচিত। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের বিচার বিভাগ ছিল সম্পূর্ণ সরকারের অনুগত। তখন বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য প্রাধান্য দেয়া হয়। বিচারকদের ভীতি-আতংকের মধ্যে রাখা হয়, যাতে তারা ফরমায়েশি রায় দিতে বাধ্য হন। স্বৈরাচারিনী হাসিনার মনোরঞ্জনকারী বিচারকরা পরবর্তীতে পুরস্কৃত হন। পুরস্কারের লোভে বিচারকরা সরকারের দিকে চেয়ে যথেচ্ছ রায় দেন। সেইসব ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’ বিচারকদের এখনো আইনের আওতায় আনা হয়নি। গণমাধ্যম অর্থাৎ সংবাদপত্র, টিভি প্রভৃতির অধিকাংশই সরকারের দাস হিসাবে ভূমিকা রাখে। সরকারের সমস্ত অন্যায়, অপকর্ম ও অপরাধকে সমর্থন করে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডে মুন্নী সাহাসহ একশ্রেণীর সাংবাদিক উসকানি দেন। শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডে ফারজানা রূপাসহ কতিপয় সাংবাদিক যে ভূমিকা রাখেন, তা ন্যাক্কারজনক। বলা বাহুল্য, তথাকথিত আওয়ামী সাংবাদিকরা নানাভাবে পুরস্কৃত হন, পক্ষান্তরে সাংবাদিক বিবেকের কণ্ঠস্বর ইনকিলাবের সম্পাদক, যায় যায় দিনের সম্পাদক, সংগ্রামের সম্পাদক, আমার দেশের সম্পাদকসহ বহু সাংবাদিক নির্যাতন, নিগ্রহ ও জেল-জুলুমের শিকার হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেকেই নিজেদের ‘আওয়ামী পুলিশ’ বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন। খুন, গুম, অপহরণ, ছিনতাই, রাজাহানি, দখলবাজি, চাঁদাবাজিসহ এমন কোনো অপরাধ নেই, যা পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যরা করেননি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যে নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতা দেখায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, তার কোনো তুলনা নেই। দেড় হাজারের ওপর মানুষকে হত্যা ও প্রায় ৩০ হাজার মানুষকে আহত ও পঙ্গু করার অপরাধ এই বাহিনীর বিরুদ্ধে। তারপরও সরকারকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। সদলবলে সরকার পালিয়ে যায় ভারতে। আবেগ সৃষ্টি করে বিচারকে প্রভাবিত করার যে প্রক্রিয়া, চেষ্টা ও তৎপরতা চলছে, তা মোটেই সমর্থনীয় নয়। আমাদের লক্ষ্য দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। আর তা করতে হলে সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে। যার যে অপরাধ, তার জন্য তাকে আইন অনুযায়ী যথাযথ শাস্তি পেতে হবে। কোনো আবেগ আইনকে তার পথ চলা থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। তাহলে সুবিচার বা বিচারে ন্যায্যতা বিনষ্ট হতে বাধ্য। প্রধান বিচারপতি, বিচারকবৃন্দ, প্রসিকিউশন টিম এবং আইনজীবিদের এ ব্যাপারে সতর্ক ও সাবধান হতে হবে। দেড় দশক ধরে যারা রাষ্ট্রীয় মদদে বিভিন্নভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, গুম করেছে, আহত হয়েছে, হামলা মামলায় জর্জরিত করেছে, বিচার থেকে বঞ্চিত করেছে, তাদের এখনই বিচার করার সময়। ভিকটিমদের জন্য সুবিচার নিশ্চিত করা বিচার বিভাগের অপরিহার্য দায়িত্ব। সুবিচার তো তাদেরও প্রাপ্য, যারা অন্যায়, অপরাধ ও জুলুম করেছে, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে। বিচার-সংশ্লিষ্ট সকলকেই স্মরণ রাখতে হবে, আইন আর আবেগ একসঙ্গে চলবে না।
