প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলনে’ প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই শহীদ ও আহতদের মূল্যায়ন ও পুনর্বাসন করাকে তার সরকারের পবিত্র দায়িত্ব বলে ঘোষণা দিয়েছেন। জুলাই গণহত্যার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিচার অবশ্যই দেশের আইনে দেশের মাটিতেই হবে বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেছেন। ফ্যাসিস্ট আমলে বিচারের নামে যে অবিচার হয়েছে, তা যেন না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্য তিনি আহ্বান জানিয়েছেন। জুলাই শহীদ ও আহতদের মূল্যায়ন ও পুনর্বাসন বিষয়ে এবং জুলাই-ঘাতকদের বিচারের প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান নিয়ে জনমনে কোনো সংশয় বা বিভ্রান্তি থেকে থাকলে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য তার অপনোদন হবে বলে আশা করা যায়। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে জাতীয় ঐক্যের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন, হিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহারের ওপর জোর দিয়েছেন। দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই, একথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন: আমরা জাতিকে বিভক্ত করে সামনে এগুতে চাই না। কারণ, জাতিকে বিভক্ত করে কখনো দেশকে এগিয়ে নেয়া যায় না। দেশকে সামনে নিতে হলে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি প্রসঙ্গে তার বক্তব্য: এ মুহূর্তে যদি আমি আমার মাকে জিজ্ঞেস করতাম যে, আপনার ওপর যে-অবিচার ও অন্যায় হয়েছে, আপনি কি চান, আমি এসবের প্রতিশোধ নিই। আমার বিশ্বাস, মা বলতেন, এ মুহূর্তে তোমার কাজ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমি জানি, আমার ভাইকে জিজ্ঞেস করলে তিনিও আমাকে একই উত্তর দিতেন। বলা বহুল্য, ঐক্যই শক্তি, বিভেদ দুর্বলতা ও ধ্বংসের বার্তাবহ। জাতীয় উন্নয়ন, অগ্রগতি ও প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয় ঐক্য জরুরিই শুধু নয়, অপিরহার্যও বটে। জাতীয় ঐক্যের রাজনীতির উদ্গতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনিই রাজনীতিকে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। আমরা জানি, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি ও কয়েকটি দল এর বিরোধিতা করে। এরা বাদে সমগ্র দেশের মানুষ ও দল এ যুদ্ধে শরীক হয়। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান এই বিভক্তি দূর করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ভারত ও ভারতের কেনা গোলামরা এই ঐক্যপ্রয়াসকে সফল হতে দেয়নি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি প্রবর্তন করেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেই নীতি-আদর্শই অনুসরণ করেন। সব ধরনের বিভেদ-বিতর্ক পেছনে ফেলে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ ও সংহত করার কাজ তিনি চালিয়ে যান অব্যাহতভাবে। পরিতাপের বিষয়, প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ঐক্যপন্থী হলেও তার কিছু নেতাকর্মীকে বিভেদপন্থীর অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে। তারা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও ভারতের ন্যারেটিভ অনুসরণ করছেন এবং সে অনুযায়ী কথা বলছেন। স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির বিষয় তারাও টেনে আনছেন। তাদের অনেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করছেন। মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে বিরোধ তৈরির প্রবণতাও কারো কারো মধ্যে দেখা যাচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে এটা এড়িয়ে যায়নি যে, বিএনপি সরকার গঠনের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা খোড়ল থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। আটক অনেকেই জামিন পাচ্ছে। বিচারে স্লথতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। কথিত আওয়ামী মিডিয়াগুলো আগের রূপে ফিরে যাওয়ার স্পর্ধা দেখাচ্ছে। ফ্যাসিস্ট-দোসর অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন, নায়িকা মাহিয়া মাহি, টিভি উপস্থাপিকা সোমা ইসলামরা সম্প্রতি বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। এই সব আলামত শুভ লক্ষণ প্রকাশ করে না, এসবের পেছনে বিএনপির একাংশ নেতাকর্মীর সমর্থন ও সহায়তা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপি কেন আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের বয়ান ও রাজনীতি অনুসরণ-অনুকরণ করবে? তাদের সহায়তা করবে? এমন ধারণা জনমনে প্রথিত হলে বিএনপিরই ক্ষতি হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিষয়টি বিশেষভাবে আমলে নিতে হবে। দলের রাজনীতির বাইরে গিয়ে, দলপ্রধানের বক্তব্য ও অভিপ্রায় বেতোয়াক্কা করে কিছু করা বা বলা মোটেই সমীচীন নয়। এটা সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের স্মরণ রাখতে হবে।
