দেশে লোডশেডিং বৃদ্ধির শঙ্কা
প্রভাত ডেক্স
মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে গত ২১ জুলাই শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের জোগান কমে গেছে। ফলে এক সপ্তাহ ধরে সর্বত্র গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। এর ফলে শিল্প, আবাসিক, সিএনজি খাতের পর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে ব্যাপক লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে টানা বৃষ্টির পর গরম বাড়লে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংও বাড়তে পারে। আর লোডশেডিং বাড়লে জনজীবনে চরম ভোগান্তি দেখা দেবে। তবে ভাসমান টার্মিনালটি কবে নাগাদ ঠিক হবে সুনির্দষ্টভাবে বলতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। যার একটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির এবং অন্যটি বেসরকারি কোম্পানি সামিট পাওয়ারের। এ দুটি এলএনজি টার্মিনাল দিয়ে গড়ে ৯০০ থেকে সর্বোচ্চ ১১শ মিলিয়ন ঘনফুট আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহ করে দেশের গ্যাসের চাহিদার জোগান স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এক্সিলারেটের টার্মিনালটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ২১ জুলাই থেকে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে তীব্র গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, শর্ট সার্কিটে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটির অনেক ক্যাবল পুড়ে গেছে। এ ছাড়া অন্যান্য যন্ত্রাংশও ক্ষতি হয়েছে। বিদেশ থেকে কারিগরি টিম এনেছে এক্সিলারেট। তারা সেটা দেখছে, ঠিক করার চেষ্টা করছে। তবে ঠিক কবে থেকে ঠিক হবে বলা যাচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ক্যাবল বা যন্ত্রাংশের সব দেশেই পাওয়া যাবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যদি কোনো যন্ত্রাংশ বা ক্যাবল দেশে পাওয়া না যায় তবে বিদেশ থেকে আনতে হবে। সেটা এনে ঠিক করতে হবে।এদিকে পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা বলেন, টার্মিনালটি ঠিক হতে এক সপ্তাহ লাগতে পারে। আবার তার আগেও হতে পারে। আবার এমনও হতে পারে যে দুই সপ্তাহ লেগে যাবে। যেহেতু কারিগরি বিষয়, তাই সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। তবে আমরা তাগাদা দিচ্ছি।জানা গেছে, বর্তমানে দেশে প্রতিশ্রুত গ্রাহকদের গ্যাসের চাহিদা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। তবে গড়ে সর্বোচ্চ সরবরাহ করা হচ্ছে ২৬শ মিলিয়ন ঘনফুট। একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে ২১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে।বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ২১ জুলাই পর্যন্ত যেখানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে গড়ে ৫ হাজার ৬০০ বা সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো, সেখানে এখন উৎপাদন হচ্ছে গড়ে ৩ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। জুলাই মাসের প্রথম দিন থেকে পিডিবির গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গড়ে ৫ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো প্রতিদিন। এখন কিন্তু ২১ জুলাইয়ের পর সেটা ক্রমান্বয়ে কমতে কমতে ৩ হাজার ৮০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, গত কয়েকদিন যাবত বৃষ্টি থাকায় কিছুটা স্বস্তি। যদি এমন গ্যাস সংকটে তীব্র গরম পড়ে তবে বিপর্যয় তৈরি হবে। একদিকে গ্যাসের জন্য মানুষের খাবার রান্নায় সংকট হবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হবে। এ ছাড়া একই সময়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বেশি চালাতে হতে পারে। ফলে পিডিবির আর্থিক লোকসান বাড়বে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক কয়েক দিনে তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ চাহিদার কারণে বড় ধরনের লোডশেডিং হয়নি। তবে গত রবিবার দিনের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া শিল্পকারখানা পুরোপুরি চালু হলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। সে ক্ষেত্রে লোডশেডিংও বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, ২১ জুলাইয়ের আগে সেটা গড়ে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট ছিল। এর ফলে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও অনেক কমে গেছে।
